ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা ও ঘাটতি কমাতে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সিইপিএ বা সেপা) স্বাক্ষরের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর মাধ্যমে আমদানি নির্ভরতা হ্রাস এবং ভারতে দেশীয় পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) জাতীয় সংসদে রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলালের এক তারকা চিহ্নিত প্রশ্নের লিখিত জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর এ তথ্য জানান। মন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে সংসদে তাঁর পক্ষে উত্তর দেন বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম।
সংসদে উপস্থাপিত তথ্যানুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে মোট দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১১ হাজার ৩৮৮ দশমিক ৩৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ ভারতে রপ্তানি করেছে মাত্র ১ হাজার ৭৬৪ দশমিক ২৩ মিলিয়ন ডলারের পণ্য, যা দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের বাণিজ্য ঘাটতির চিত্র নির্দেশ করে।
বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী জানান, এই ভারসাম্যহীনতা দূর করতে সরকার দেশীয় শিল্পের বিকাশ, আমদানি বিকল্প পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদনযোগ্য পণ্যের আমদানি নিরুৎসাহিত করার নীতি অনুসরণ করছে। তবে দেশীয় শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিকে সরকার উৎসাহিত করছে। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখেই প্রস্তাবিত ‘আমদানি নীতি আদেশ, ২০২৬-২০২৯’-এ দেশীয় শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার সুষ্ঠু ব্যবহার এবং আমদানি ব্যবস্থাপনাকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও যুগোপযোগী করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মুহাম্মদ আবদুল খালেকের অপর এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী সংসদে জানান, বর্তমানে বিশ্বের দুটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে। এর মধ্যে ২০২০ সালের ৬ ডিসেম্বর ভুটানের সঙ্গে প্রথম এবং অতিসম্প্রতি ২০২৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি জাপানের সঙ্গে আরেকটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
সংরক্ষিত নারী আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিশ্বের ২০২টি গন্তব্যে মোট ৮১২টি পণ্য রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে ওভেন পোশাক, নিটওয়্যার, হোম টেক্সটাইল, হিমায়িত ও জীবন্ত মাছ, কৃষিজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত দ্রব্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাদুকা এবং প্রকৌশল দ্রব্যাদি রপ্তানি করে ৪৪ হাজার ১৬৭ দশমিক ৮৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় হয়েছে, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৯১ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা নিয়ে বগুড়া-৬ আসনের সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশার প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাতের ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন, আন্তর্জাতিক বিমা ব্যবস্থা ও সরবরাহ শৃঙ্খলে সাময়িক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পথ হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, এলএনজি, এলপিজি এবং সামুদ্রিক পরিবহন ব্যয়ের ওপর ঊর্ধ্বমুখী চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
বাংলাদেশ সরাসরি এই সংঘাতের পক্ষ না হলেও বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকায় কিছু পরোক্ষ অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এই সংঘাতের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি বা ব্যবসা-বাণিজ্যে সরাসরি কোনো পরিমাপযোগ্য আর্থিক ক্ষতি হয়নি বলে তিনি জানান।
সবশেষে, কুমিল্লা-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালামের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী জানান, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে চূড়ান্তভাবে উত্তরণ পেতে যাচ্ছে। এর ফলে তৈরি পোশাকসহ সামগ্রিক রপ্তানি খাত কিছু নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন উন্নত দেশের বাজারে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা, সহজ উৎসবিধি এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক অগ্রাধিকার সুবিধায় পরিবর্তন আসতে পারে। তবে সরকার এই সম্ভাব্য সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ইতিমধ্যেই বহুমুখী ও কার্যকর কৌশল গ্রহণ করেছে।
মন্তব্য করুন