নিজস্ব প্রতিবেদক:
২৫ অক্টোবর ২০২৫, ৩:২০ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ
পাঠক সংখ্যা ১৯৫৮ জন

সৈয়দ আবুল হোসেন : সফলতা ও জনপ্রিয়তার আড়ালে এক নিভৃতচারী সাধক

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরবর্তী ইতিহাসে খুব কম মানুষই পার্থিব সাফল্য ও আধ্যাত্মিক বিনয়ের এমন মেলবন্ধন ঘটিয়েছে, যেমনটি ঘটেছে সৈয়দ আবুল হোসেন-এর জীবনে। মাদারীপুরের মাটির সন্তান এই মানুষটি নিজ প্রচেষ্টায় ব্যবসা, শিক্ষা ও রাজনীতির শীর্ষে পৌঁছেছিলেন অদম্য সততা, পরিশ্রম ও দূরদৃষ্টির মাধ্যমে। অথচ এই দৃশ্যমান সাফল্যের অন্তরালে বাস করতেন আরেক সৈয়দ আবুল হোসেন—যিনি সুফিবাদের প্রতি নিবেদিত, ধ্যানমগ্ন ও আত্মনিয়ন্ত্রিত এক সাধক; যাঁর আধ্যাত্মিক আলো ছিল নীরব অথচ দীপ্ত, জাগতিক ধূলায় আচ্ছন্ন।

তিনি ছিলেন দেশভাগের পরবর্তী সময়ে জন্ম নেওয়া প্রথম প্রজন্মের গ্রামীণ তরুণদের একজন, যারা ১৯৭১-এর পর মুক্ত, স্বনির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্ন বুকে ধারণ করেছিল। সীমিত সুযোগের মধ্যে বেড়ে ওঠা, শৈশবে লম্বা রাস্তা হেঁটে স্কুলে যাওয়া এই মানুষটি শিক্ষা-কেই মুক্তি ও প্রগতির পথ মনে করতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর হয়ে তিনি ব্যবসা, জনসেবা ও দাতব্য কাজের সমন্বয়ে অক্লান্ত পরিশ্রমে গড়ে তোলেন এক বিস্তৃত কর্মজীবন। ব্যক্তিস্বার্থ তাঁর জীবনের লক্ষ্য ছিল না; ছিল নিজের মাটির প্রতি ঋণ শোধ করার এক অবিরাম প্রয়াস, এলাকার মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের অদম্য আকুতি।

আরও পড়ুন:

জীবনের প্রারম্ভেই তিনি মাদারীপুরে গড়ে তুলেছিলেন বহু স্কুল-কলেজ, যা আমূল বদলে দেয় এক অবহেলিত অঞ্চলের শিক্ষার চিত্র। তাঁর স্বপ্ন ছিল কেবল নগরোন্নয়ন নয়, এমন এক বাংলাদেশ যেখানে প্রত্যন্ত গ্রামের প্রতিটি শিশুই উচ্চশিক্ষা ও মর্যাদার সুযোগ পাবে। তিনি ব্যক্তিগতভাবে বহু দরিদ্র ছাত্রছাত্রীর শিক্ষার দায়িত্ব নিয়েছিলেন, এমনকি মেধাবী তরুণদের বিদেশে উচ্চশিক্ষার পথও সুগম করেছিলেন। তিনি ব্যবসা করে অর্থ উপার্জন করতেন, কিন্তু ব্যয় করতেন মানুষের জন্য—কারণ তাঁর বিশ্বাস ছিল, খিদমত (সেবা)-ই ইবাদতের সর্বোচ্চ রূপ।

একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন সাকো ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড (SAHCO International Ltd.), বাংলাদেশের অন্যতম অগ্রগামী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, যার পরিধি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিস্তৃত। রাজনীতিতেও তিনি ছিলেন এক নিষ্ঠাবান কর্মী—চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং একাধিক মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করেন। দেশের দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো উন্নয়নে, বিশেষ করে পদ্মা সেতুর প্রাথমিক পর্যায়ে, তাঁর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। কিন্তু ইতিহাসে বহু সংস্কারক যেমন ক্ষমতা ও নীতির দ্বন্দ্বে পরীক্ষিত হন, তিনিও তেমনি এক গভীর আত্মপরীক্ষার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেন জীবনের শেষ অধ্যায়।

যখন বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে সরে যায়, দুর্নীতির অভিযোগ তোলা হয়, এবং গভীর জিওপোলিটক্যাল ষড়যন্ত্রের শিকার হন, মিডিয়াতে অপপ্রচার চলতে থাকে, তখন তিনি অপমান ও রাজনৈতিক নিঃসঙ্গতার এক কঠিন সময়ের মুখে পড়েন। কিন্তু আন্তর্জাতিক তদন্ত ও কানাডার ফেডারেল কোর্টের রায়ে প্রমাণিত হয় তিনি সম্পূর্ণ নির্দোষ। সম্মান ফিরলেও তিনি রাজনীতিতে আর ফেরেননি। তিনি নিজেকে প্রত্যাহার করেন জনজীবন থেকে—যেন তাঁর পার্থিব দায়িত্বসমূহ ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়ে গেছে। যে খ্যাতি ও সাফল্য একসময় তাঁকে ঘিরে রেখেছিল, তা মিলিয়ে যায় নীরবতায়; উঠে আসে লুকানো সাধক-সত্তা।

যাঁরা তাঁর ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তাঁরা জানেন তিনি ছিলেন গভীর আধ্যাত্মিক বিশ্বাস ও সুফি সাধনার অনুগামী—খ্যাতনামা ও প্রভাবশালী সুফি পীর খাজা এনায়েতপুরী (রহ.)-এর নকশবন্দি-মুজাদ্দেদিয়া তরিকার একজন একনিষ্ঠ মুরিদ। তিনি সবসময় চেয়েছেন রোগশয্যা ছাড়াই, কারও বোঝা না হয়ে, শান্তিতে দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়া। এবং সেটাই হয়েছে। যদিও শুরুতে নিজ এলাকায় তাঁর দাফনের কথা ছিল, শেষ পর্যন্ত নিয়তির নির্দেশে তাঁর দেহ শায়িত হয় প্রিয় পীরের মাজারের পাশে, যা আধ্যাত্মিক বিনয় ও ঈশ্বরপ্রদত্ত স্বীকৃতির চূড়ান্ত প্রতীক।

তাঁর জীবন একটা আধুনিক সুফি কাহিনির মতো মনে হয়—একজন মানুষ যিনি সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছে, অপমান ও ক্ষত পেরিয়ে, সব ছেড়ে ফিরে গেলেন সত্যের সেবক হয়ে। এই উত্থান-পতনের দ্বন্দ্বেই লুকিয়ে আছে তাঁর পবিত্রতা। জীবদ্দশায় তাঁর সাধুত্ব ছিল আড়ালে; মন্ত্রী ও ব্যবসায়ীর ভূমিকায় ঢাকা ছিল। কিন্তু মৃত্যুর পর তাঁর জীবনরেখায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে সেই অনন্যতা—সেবার মধ্য দিয়ে উন্নতি, কষ্টের মধ্য দিয়ে আত্মসমর্পণ, আর ভালোবাসার মধ্য দিয়ে প্রত্যাবর্তন।

সৈয়দ আবুল হোসেন কেবল রাজনীতিক বা ব্যবসায়ী ছিলেন না; তিনি ছিলেন স্বাধীনতার পরের সেই বিরল প্রজন্মের প্রতিনিধি, যারা বিশ্বাস করতেন—স্বাধীনতার প্রকৃত মানদণ্ড হলো শিক্ষা, মানবতা ও আত্মজাগরণ। তিনি তাঁর অঞ্চলকে রূপান্তরিত করেছিলেন, মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন, আর বেঁচে ছিলেন সুফিদের সেই চিরন্তন দর্শনে—মানবসেবা-ই ঈশ্বরসেবা।

তাঁর শান্ত বিদায় ও আলোকোজ্জ্বল উত্তরাধিকারে তিনি রয়ে গেছেন সেই রূপে, যাকে সুফিরা বলেন ইনসান-ই-কামিল—অর্থাৎ পরিপূর্ণ মানুষ, যিনি জগৎ ও জ্ঞান দুই-ই অর্জন করেন, কিন্তু শেষে উভয়কেই ত্যাগ করেন পরমের জন্য।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি আজ থেকে বঙ্গভবনে অফিস করবেন

কাউন্সিলর একরামুল হত্যাঃ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিফতাহ সেনা হেফাজতে

হজের নিবন্ধন শুরু, আবেদন করতে পারবেন না যারা

শেখ হাসিনাসহ ৪৫ জনের দুই মামলার বিচার শুরু আজ

সংবিধান সংস্কারে অগ্রগতি না হলে রাজপথে নামবে এনসিপি

তুরস্ক সফর শেষে দেশে ফিরেছেন সেনাপ্রধান

৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন

মহেশপুর সীমান্তে ৬ জনকে পুশ-ইনের চেষ্টা

শনিবার রাজধানীর যেসব এলাকার দোকান ও মার্কেট বন্ধ

ভারতীয়দের ভিসা-সুবিধা প্রত্যাহার করল চার দেশ

১০

দিল্লিতে সিজেপি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরকারের আনুষ্ঠানিক বৈঠক

১১

নির্ধারিত সময়ের দুই দিন আগেই দেশে ফিরলেন স্পিকার

১২

মোদি সরকারের আশ্বাসে ২৬ দিনের অনশন ভাঙলেন সোনাম ওয়াংচুক

১৩

স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিচ্ছেন রাষ্ট্রপতি,

১৪

ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে রুবাইয়াত হোসেনের ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ নির্বাচিত

১৫

ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে মোদির আমন্ত্রণ

১৬

আল-আকসা প্রাঙ্গণে ১,৩০০-এর বেশি ইসরায়েলি প্রবেশ

১৭

ছাত্র আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানালেন সালমান খান

১৮

যুক্তরাষ্ট্র–সৌদি আরবের বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর

১৯

পোশাক শিল্পের প্রতিবন্ধকতা দ্রুত দূর করার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

২০