
উগ্রবাদের উত্থানকালে একজন মহান ওলী, কামেল মোকাম্মেল সত্যপীরের চলে যাওয়া কোন জাতীয় শোকের বিষয় না! এই সময়ে যখন চারিদিকে মাজার ভাঙার তাণ্ডব চলছে, মরমীবাদের বিরুদ্ধে ক্রমাগত আঘাত হানা হচ্ছে তখন এই দুনিয়া থেকে নিভে গেল এক রুহানী নূর, জামানার একজন জবরদস্ত সুফি সাধকের ওফাত হলো, একজন বাক্যসিদ্ধ মহাপুরুষ মিশে গেলেন আল্লাহর জাতপাকের সাথে। শাহানশাহে তরিকত এনায়েতপুর পাক দরবার শরীফের দয়াল সাজ্জাদানশীন হুজুরপাক হযরত মাওলানা শাহ সুফি খাজা কামাল উদ্দিন নূহ মিঞা (রঃ) ১০৩ বছর বয়সে গত ২৫ নভেম্বর ২০২৫ অগণিত ভক্ত আশেকান-জাকেরানদেরকে এতিম করে দারুল বাকায় পর্দা নিলেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
এমন এক কামেল পীরের বায়াত গ্রহণ এই অধম খাদেমের জীবনের পরম প্রাপ্তি। তাকে দেখেই জানতে পারি একজন সূফী সাধক হতে পারেন ইব্রাহিমের মত বিশ্বাসী ও ত্যাগী, আব্দুল কাদের জিলানীর মত রূহানী শাহেনশাহ, শাইখ আল ফেসানির মত মুজাদ্দেদ, মনসুরের মত খোদা প্রেমী, ওয়ায়েছ করণীর মত মাজ্জুব, ইউনুস এমরের মত দরবেশ কবি, মাওলানা রুমির মত ঐশী জ্ঞানী, হতে পারেন রাবেয়া বসরীর মত বঞ্চনার আঘাতে জর্জরিত হয়েও বিনা ওজরে খোদা-প্রেমে জারেজার। হতে পারেন আমার মুর্শিদ কেবলাজানের মত গরীব-দরদী, সর্বত্যাগী ও প্রচারবিমুখ। যিনি তাঁর আপন পীরের প্রচার ও তাবেদারী করেই কাটিয়ে দিলেন দীর্ঘ এক সাধনা জীবন। জামানার জবরদস্ত পীর হয়েও নিজেকে কখনো পীর দাবী না দিয়ে শত বছর পার করে দিলেন দুনিয়াদারী থেকে আড়াল হয়ে স্বীয় পীরের দরবারের খাস খাদেম রূপেই। মুর্শিদ প্রেমের যেমন এক অনুকরণীয় আদর্শ তেমনি আপন পীরের জন্য আত্মত্যাগেরও এক ব্যতিক্রমী নজির আমার পীরানে পীর দস্তগীর পাক কেবলাজান।
আরও পড়ুন:
অতি সাধারণ জীবনযাপন, আধ্যাত্মিক প্রজ্ঞা আর রাজনৈতিক দূরদৃষ্টির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আমার মুর্শিদ। নূহ নবীর মতই এক ক্রান্তিকালে যার আবির্ভাব, তার অদৃশ্য নায়ে বিশ্বাস রেখেই কত মানুষ পার হয়েছে এই নশ্বর দৃশ্যজগত! আমার মুর্শিদ বলেন, “সুফিবাদের সর্বপ্রধান অবলম্বন হলো প্রেম বা এস্ক। প্রেমই হলো ঈমানের ভিত্তি। এই প্রেমের পরম উপলব্ধি এবং আবির্ভাবের মধ্যেই এলমে লাদুন্নির জ্যোতির উদয় হয়। ঈমানের এই জ্যোতি যাঁদের অন্তরে নেই তারা আল্লাহ সম্বন্ধে গাফেল এবং ধর্ম সম্বন্ধে অন্ধ।” এই প্রেমকে আমার মুর্শিদের মুর্শিদ খাজা এনায়েতপুরী (রা:) লাভ করেছিলেন তাঁর নিজ মুর্শিদের প্রতি প্রতিষ্ঠিত গভীর বিশ্বাস ও ভালবাসার মাধ্যমে। আমার মুর্শিদ ধর্ম-বর্ণ-জাতি-গোত্র নির্বিশেষে লাখো লাখো ভক্ত আশেকানের অন্তরে মহব্বতের তুফান তুলে জাগ্রত রেখেছেন অনন্ত প্রেম। মুরিদের বিপদে তিনি সবচেয়ে বেশি পেরেশান, গরীবের দুঃখে তিনি আজীবন গরীব থেকেছেন, মাটিতে পেতেছেন শয্যা, ধনী কি গরীব কেঁদেছেন মানুষের দুর্দশায়, মহব্বতের তুফান তুলে পরম প্রেমে ডুবিয়ে রেখেছেন অগণিত মুরিদদের।
পীরকে অনেকেই শিক্ষক বলে কিন্তু মুরিদের কাছে তিনি তার চেয়েও বড় কিছু যেন এক নীরব দরজা। যে দরজা দিয়ে প্রথমবার নিজের ভিতরের অন্ধকারে আলো ঢোকে। পীরের হৃদয়ে আল্লাহর নূর জ্বলে উঠে আর মুরিদ নিজের হৃদয়টি সেই নূরের সামনে রেখে শেখে কিভাবে বাঁচতে হয়, কিভাবে দেখতে হয়, কিভাবে চিনতে হয়, কিভাবে জানতে হয় দৃশ্য ও অদৃশ্য জগতের ভেদ। একজন পীর শুধু ধর্ম শেখান না। তিনি মুরিদের চোখ ধুয়ে দেন, হৃদয় নরম করেন, অহং ভেঙে দেন। আর মুরিদ পীরকে শুধু ভালোবাসেন না, তিনি তাঁকে ভরসা করেন নিজের অন্তরের চেয়েও বেশি। মুরিদের আসল জন্ম তখনই হয়, যখন সে নিজের চোখে না দেখে পীরের চোখ দিয়ে দেখতে শুরু করে, নিজের ‘আমি’-কে পেছনে সরিয়ে দেয়, এবং স্বীয় পীরের নূর, চরিত্র, আদব, আখলাক সবকিছুকে নিজের ভেতরে ধারণ করতে থাকে, যতক্ষণ না তার আচরণ, চিন্তা, নিয়ত সবই পীরের আদর্শের অনুগামী হয়ে ওঠে। এভাবেই একজন আদর্শ মুরিদ তার পীরের সাথে মিশে গিয়ে ফানাফিশ শাইখ হয়। এটি একটি রুহানি হাল যেখানে মুরিদ নিজের নফস, অহং, সন্দেহ, অস্থিরতা, রাগ-ক্ষোভ সবকিছুকে থামিয়ে দেয়, এবং আপন শাইখ বা মুর্শিদের মধ্যে বিলীন হয়ে যায়।
সুফি ধারায় পীর-মুরিদের সম্পর্ক কেবল ধর্মীয় আনুগত্যের নয়। মুরিদ পীরের সঙ্গে যুক্ত থাকে কথায় নয়, সামাজিক সম্পর্কে নয়, এক অদৃশ্য নাড়ির বন্ধনে। পীর দেহত্যাগ করলে সেই নাড়িতেই টান পড়ে। শব্দহীন ব্যথায় যেন ভেতরের আকাশটা মুষড়ে যায়। মাতম তখন বাহিরে নয়—ভেতরে। পীরের শোকে মুরিদ জন্মায় মাতমের ভেতর থেকেই। মুরিদ হঠাৎ খেয়াল করে পীর তো চলে যাননি, তিনি কেবল বাইরের দেহ ছেড়ে অন্তরের ভেতর ঘরে প্রবেশ করেছেন। সুফিরা বলেন, “শাইখ দেহ ছেড়ে গেলে তার পদচিহ্ন মাটি থেকে উঠে আসে মুরিদের বুকের ভিতর।” এই থেকে যে কষ্ট জন্মায়, সে কোনো বিচ্ছেদ নয় বরং এক ধরণের ফানা। আর সেই ফানার ভিতরেই মুরিদ প্রথমবার তার পীরকে সত্যিকারের নিজের করে পায়—যেমন আগুন নিভে গেলে তার উষ্ণতা হাতের তালুতে থেকে যায়। বাতাসে তাঁর উপস্থিতি থাকে যেন গায়েবি নিঃশ্বাস আমাদের বদলে দিচ্ছে নিঃশব্দে যেন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দয়াল, সারা বাতাসে সুকূন ছড়াচ্ছেন। পীরের জাগতিক মৃত্যু মুরিদের জন্য সমাপ্তি নয়—এক নতুন শুরু। মুরিদ যে পীরকে অনুসরণ করে, নিছক দুনিয়াদারির কারণে নয় বরং এক গভীর রুহানী জজবায়, এক নীরব ঐশী টানে যা মানুষের সত্তাহীন মুহূর্তগুলোকেও মাহবুবের দিকে ফিরিয়ে দেয়। এই সম্পর্ক শব্দ নয়, বাণী নয় বরং রুহানী রাবিতা, এক অদৃশ্য অস্তিত্বের মতো, যা বুকের ভিতর একটু নড়লেই পীরের নিঃশ্বাসের পরশ লাগে।
পীর চলে যাওয়া একজন মুরিদের জন্য কত বেদনার সে শুধু মুরিদই জানে। ভক্ত-আশেকান আর জাকেররাই জানে কলিজা ছেঁড়া সে বেদনার ভার। রুমী বলেছিলেন, “মুরিদ যখন শাইখকে হারায়, সে তখন তাকে নিজের ভিতরে ফিরে পায়। বাহিরের পর্দা সরে গেলে বাতিনের দরজা খুলে যায়।” পীরের মৃত্যু তাই অনুপস্থিতি নয়, এটা তাব্দিল, স্থান-বদল; আগে তিনি সামনে ছিলেন, এখন সীরের আরো গভীরে। যেখানে দেহ পৌঁছায় না কিন্তু নূর পৌঁছায়। শেষ পর্যন্ত মুরিদ বুঝে—পীরের গায়েব হওয়া আদতে আরো গভীরভাবে হাজির হওয়া।
No tags found for this post.
মন্তব্য করুন