ওটিটি (OTT) প্ল্যাটফর্মে যখন ক্রাইম, থ্রিলার আর অ্যাকশন ঘরানার গল্পের জয়জয়কার, ঠিক তখনই সম্পূর্ণ ভিন্ন মেজাজের এক মানবিক গল্প নিয়ে হাজির হলো চরকির নতুন ওয়েব ফিল্ম ‘লাইফলাইন’। সম্পর্ক, দায়বদ্ধতা আর বাবা-মেয়ের চিরন্তন আবেগকে কেন্দ্র করে সিনেমাটি নির্মাণ করেছেন কাজী আসাদ। প্রিয় মানুষকে বাঁচাতে একজন মানুষ কতটা পথ পাড়ি দিতে পারে—সেই চিরন্তন প্রশ্নের উত্তরই খুঁজেছে এই চলচ্চিত্র।
# রহস্য ও আবেগের মিশেলে গল্পের বুনন
সিনেমার মূল চরিত্র অনন্যা (বিদ্যা সিনহা মিম)। এক অচেনা চরে তার আকস্মিক আগমন দিয়ে গল্পের শুরু। এক দুর্গম গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া অনন্যাকে চরের মানুষজন যখন ফিরিয়ে দেয়, তখন টাকার বিনিময়ে তার সঙ্গী হয় স্থানীয় বাইকচালক কোরবান (রেজওয়ান পারভেজ)। অনন্যার উদ্দেশ্য ‘আক্কাস আলী’ (আ খ ম হাসান) নামের এক ব্যক্তিকে খুঁজে বের করা। কিন্তু কেন এই মরিয়া অনুসন্ধান? কেনই বা এত তাড়াহুড়ো? এমন কিছু অনুচ্চারিত রহস্যকে সঙ্গী করেই এগিয়ে যায় ‘লাইফলাইন’-এর কাহিনী।
# ধীরস্থির নির্মাণ ও নান্দনিক ভিজ্যুয়াল
ছবির প্রথমার্ধের গতি বেশ মন্থর। পরিচালক কোনো ধরনের অতি-নাটকীয়তার আশ্রয় না নিয়ে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত উপায়ে দর্শককে চরিত্রগুলোর মনস্তত্ত্বে প্রবেশ করিয়েছেন। দ্বিতীয়ার্ধে এসে গল্পের জট খুলতে শুরু করলে সিনেমাটি কাঙ্ক্ষিত গতি ফিরে পায়।
এর আগে ‘আধুনিক বাংলা হোটেল’ দিয়ে প্রশংসিত হওয়া নির্মাতা কাজী আসাদ এবারও মফস্বল ও গ্রামবাংলার চিরচেনা রূপকে পর্দায় দারুণভাবে ধারণ করেছেন। নদী, চর, কাঁচা রাস্তা আর সূর্যমুখী বাগানের ভেতর দিয়ে বাইক এগিয়ে যাওয়ার দৃশ্যগুলো দর্শকদের চোখে লেগে থাকার মতো। চিত্রগ্রাহক ড্যানিয়েল হাওলাদারের ক্যামেরার কাজ এ ক্ষেত্রে আলাদা প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য।
# অভিনয়ে পরিণত মিম, চমকে দিলেন আ খ ম হাসান
*বিদ্যা সিনহা মিম:গ্ল্যামারাস নায়িকার খোলস ভেঙে এক সাধারণ মধ্যবিত্ত তরুণীর চরিত্রে মিম তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম পরিণত ও সাবলীল অভিনয় উপহার দিয়েছেন। চরিত্রটির বিচলিত ও চিন্তিত ভাব তিনি পর্দায় চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
* আ খ ম হাসান:* দীর্ঘদিন ধরে মূলত কৌতুক অভিনেতা হিসেবে পরিচিত আ খ ম হাসান আরও একবার ভিন্নধর্মী চরিত্রে চমকে দিলেন। এক অসহায় বাবার চরিত্রে তাঁর স্বল্প সময়ের উপস্থিতি দর্শকদের মনে গভীর দাগ কেটে যায়।
*অন্যান্য কলাকুশলী: বাইকচালক কোরবানের চরিত্রে রেজওয়ান পারভেজ অত্যন্ত চটপটে ও সাবলীল ছিলেন। তবে খাইরুল আলম সবুজ (মিমের বাবা) এবং রেজওয়ান-ইভার সাব-প্লটটিকে পর্দায় আরেকটু সময় দিলে গল্পের বুনন আরও জমাট হতো। খলচরিত্রে গাজী রাকায়েত এবং শিশুশিল্পী আনিসা নুর আয়াতসহ বাকিদের অভিনয়ও ছিল বিশ্বাসযোগ্য।
# পরিমিত আবহ ও শ্রুতিমধুর গান
সিনেমার মেজাজের সঙ্গে মিলিয়ে জাহিদ নিরবের আবহ সংগীত ছিল বেশ পরিমিত (মিনিমাল)। আবেগঘন মুহূর্তে অতিরিক্ত শব্দের ব্যবহার না করে নীরবতাকে যেভাবে কাজে লাগানো হয়েছে, তা প্রশংসনীয়। এছাড়া দেবাশীষ দাসের কণ্ঠে ‘খুঁজতে খুঁজতে’ ও ঐশীর কণ্ঠে ‘আমারে নাও’ গান দুটি কাহিনীর আবহকে আরও বেগবান করেছে।
*চূড়ান্ত মূল্যায়ন:যাঁরা দ্রুতগতির থ্রিলার বা চমকে ঠাসা (টুইস্ট) গল্প পছন্দ করেন, তাঁদের কাছে ‘লাইফলাইন’ কিছুটা ধীরগতির মনে হতে পারে। তবে জীবনঘনিষ্ঠ, শান্ত ও নিখাদ আবেগের গল্প যাঁরা ভালোবাসেন, ওটিটির ভিড়ে ‘লাইফলাইন’ তাঁদের মনের তৃষ্ণা মেটাবে।
মন্তব্য করুন