
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় কাঠামোগত দুর্বলতা ও মানগত ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে সবচেয়ে আগে প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট দার্শনিক লক্ষ্য নির্ধারণ—এমন মত দিয়েছেন ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী, যিনি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়-এর উপাচার্য।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে দেশের শিক্ষার মানে ধীরে ধীরে অবনমন দেখা গেছে। শিক্ষার্থী সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও সেই অনুপাতে অবকাঠামো, দক্ষ শিক্ষক ও আধুনিক শিক্ষণ-পদ্ধতির উন্নয়ন ঘটেনি। ফলে শিক্ষা সেবার মান প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।
তিনি উল্লেখ করেন, দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বাংলা, ইংরেজি, মাদরাসা ও কারিগরি—এমন বহু ধারার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। এই বৈচিত্র্যকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেলে তা শক্তিতে পরিণত হতে পারত, কিন্তু বাস্তবে তা শিক্ষার্থীদের সক্ষমতায় বৈষম্য তৈরি করছে।
বিশেষ করে প্রাথমিক ও নিম্নমাধ্যমিক স্তরে ভাষাগত দুর্বলতা এবং সমন্বিত STEM (বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত) শিক্ষার অভাব একটি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি। দক্ষ শিক্ষক সংকটও এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ড. চৌধুরীর মতে, উন্নত দেশগুলোর শিক্ষাব্যবস্থায় একটি সুসংগঠিত কাঠামো ও ধারাবাহিকতা রয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীদের বিশ্লেষণধর্মী চিন্তাভাবনা ও সৃজনশীলতা বিকাশে গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেখানে একাধিক পাঠ্যবই ও নমনীয় কারিকুলাম ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের চিন্তার বৈচিত্র্য বাড়ানো হয়।
বাংলাদেশে শিক্ষাকে এখনও পরীক্ষার ফলাফল ও জিপিএকেন্দ্রিক করে দেখার প্রবণতা রয়েছে বলে তিনি সমালোচনা করেন। তার মতে, এই সংস্কৃতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা তৈরি করছে এবং অনেক শিক্ষার্থীকে হতাশ করে তুলছে। উন্নত বিশ্বে শিক্ষার্থীর প্রকৃত সাফল্য মূল্যায়ন করা হয় তার কাজ, দক্ষতা ও সামাজিক অবদানের ভিত্তিতে।
কর্মসংস্থানের সঙ্গে শিক্ষার অসামঞ্জস্যের বিষয়েও তিনি গুরুত্ব দেন। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক গ্র্যাজুয়েট তৈরি হলেও সেই অনুপাতে চাকরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। তাই শিক্ষার্থীদের উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা গড়ে তোলা এবং দক্ষতা উন্নয়নে জোর দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
গবেষণা খাতে সীমাবদ্ধতার পেছনে রাষ্ট্রীয় সহায়তার অভাব ও সমন্বয়ের ঘাটতিকে দায়ী করে তিনি বলেন, দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর গবেষণা-ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা জরুরি। এ ক্ষেত্রে মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান ও দক্ষ মানবসম্পদকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিনিয়োগ করার আহ্বান জানান।
ডিজিটাল যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি। বিশ্লেষণধর্মী কাজে AI ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও সৃজনশীল চিন্তায় মানবিক মেধার বিকল্প নেই বলে তিনি মনে করেন।
সবশেষে, শিক্ষার মূল লক্ষ্য হিসেবে তিনি নৈতিকতা, সততা ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক তৈরি করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার মতে, একটি উন্নত রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হলে আগে একটি মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজ তৈরি করতে হবে, আর সেই দায়িত্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেই নিতে হবে।
মন্তব্য করুন