১৯৫০-এর দশকে হিন্দি সিনেমার রোমান্টিকতার প্রতীক ছিলেন তিনি। যাঁর ছবি মানেই ছিল প্রেক্ষাগৃহে উপচে পড়া ভিড় আর কালজয়ী সব গান। তবে ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে, বলিউডের সেই ঝলমলে আলো থেকে একসময় নিঃসঙ্গ অন্ধকারে হারিয়ে যান অভিনেতা ভারত ভূষণ। একসময়ের এই শীর্ষ তারকার জীবনের শেষ অধ্যায় আজও ভারতীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম বেদনাদায়ক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
‘বাইজু বাওরা’ থেকে তারকাখ্যাতি
১৯৪১ সালে ‘চিত্রলেখা’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ক্যারিয়ার শুরু করলেও, ১৯৫২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘বাইজু বাওরা’ ভারত ভূষণকে রাতারাতি তারকাখ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে দেয়। এরপর ‘বরসাত কী রাত’ ও ‘মির্জা গালিব’-এর মতো একের পর এক সফল ছবি তাঁকে দিলীপ কুমার, রাজ কাপুর কিংবা মধুবালার সমকক্ষে নিয়ে যায়। প্রচলিত ‘মাচো’ ইমেজের বাইরে গিয়ে চোখের ভাষা, কণ্ঠের কোমলতা আর বিষণ্ন রোমান্টিক অভিনয়ে তিনি দর্শকদের মাঝে এক শিক্ষিত ও ভদ্র নায়কের ইমেজ তৈরি করেছিলেন।
‘আশীর্বাদ’ ও বৈভব
সাফল্যের মধ্যগগনে থাকা অবস্থায় মুম্বাইয়ের বান্দ্রায় ভারত ভূষণের তিনটি বিলাসবহুল বাংলো ছিল। এর মধ্যে অন্যতম ছিল বিখ্যাত ‘আশীর্বাদ’ বাংলোটি। পরবর্তীতে এই বাড়িটিই কিনেছিলেন অভিনেতা রাজেন্দ্র কুমার এবং এরপর এর মালিক হন বলিউডের প্রথম সুপারস্টার রাজেশ খান্না।
ভুল সিদ্ধান্ত ও পতন
অভিনয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্র প্রযোজনায় নামাই ভারত ভূষণের জীবনের টার্নিং পয়েন্ট বা পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তৎকালীন সময়ে ব্যক্তিগত অর্থায়নে সিনেমা নির্মিত হতো। পরপর কয়েকটি সিনেমা ব্যবসায়িক আলোর মুখ না দেখায়, বিশেষ করে ‘দুজ কা চাঁদ’ ছবির বিশাল লোকসানে দেউলিয়া হয়ে পড়েন তিনি। ঋণ শোধ করতে একে একে গাড়ি, বাড়ি ও জমি বিক্রি করে বান্দ্রার বিলাসবহুল জীবন ছেড়ে মালাডের একটি সাধারণ ফ্ল্যাটে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন তিনি।
জীবনসংগ্রাম ও নিষ্ঠুর বাস্তবতা
তীব্র আর্থিক সংকটের মাঝেও আত্মসম্মান বজায় রেখেছিলেন ভারত ভূষণ। প্রধান চরিত্র থেকে ছিটকে পড়ে ক্যারিয়ারের শেষ দিকে ছোট ছোট বা পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করেছেন, তবুও কাজ ছাড়েননি।
তাঁকে নিয়ে এক স্মৃতিচারণায় অমিতাভ বচ্চন লিখেছিলেন, একবার সকালে গাড়ি দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি দেখেন—বাসস্ট্যান্ডে সাধারণ মানুষের ভিড়ে দাঁড়িয়ে আছেন কিংবদন্তি ভারত ভূষণ, অথচ কেউ তাঁকে চিনতেও পারছে না। দৃশ্যটি অমিতাভকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল এবং বিনোদন জগতের খ্যাতির ক্ষণস্থায়ী রূপকে মনে করিয়ে দিয়েছিল।
নিঃসঙ্গ বিদায়
প্রবীণ সাংবাদিক আলী পিটার জনের এক লেখায় উঠে আসে, ১৯৯২ সালে যখন ৭২ বছর বয়সে ভারত ভূষণ হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান, তখন তাঁর শেষকৃত্যে মাত্র আটজন মানুষ উপস্থিত ছিলেন। যদিও তাঁর মেয়ে অপরাজিতা ভূষণ পরবর্তীতে কিছু অতিরঞ্জিত গুজব খণ্ডন করে জানান যে, তাঁর বাবা শেষ দিন পর্যন্ত মর্যাদার সঙ্গেই বেঁচে ছিলেন। তবে এটি অনস্বীকার্য যে, জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে এই কালজয়ী তারকা এক প্রকার নিঃসঙ্গ ও অবহেলিতই রয়ে গিয়েছিলেন।
No tags found for this post.
মন্তব্য করুন