সিপিএন ডেস্ক
২২ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৩৯ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ
পাঠক সংখ্যা ১৬২ জন

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ফসলহানির শঙ্কা

ছবিঃ সংগৃহীত

রাজশাহী অঞ্চল দিয়ে বয়ে যাচ্ছে মাঝারি তাপপ্রবাহ। খরতাপে মাঠঘাট ফেটে চৌচির। সেই সঙ্গে সমানে চলছে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট। ফলে অচল হয়ে পড়েছে বরেন্দ্র অঞ্চলের অর্ধেকের বেশি সেচযন্ত্র। সেচের অভাবে মাঠে পুড়ছে উঠতি বোরো ফসল। জ্বালানি সংগ্রহে জেলার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটছে কৃষক। এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে রাজশাহীসহ গোটা উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বোরো উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার শঙ্কা কৃষকদের। সেচের অভাবে আগাম জাতের টি-আমন আবাদও প্রায় বন্ধের উপক্রম।

কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাজশাহীসহ দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোয় কয়েকদিন ধরেই বয়ে চলেছে মাঝারি তাপপ্রবাহ। রাজশাহী ও আশপাশের জেলাগুলোয় দিনে গড় তাপমাত্রা থাকছে ৩৮ থেকে ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দক্ষিণ-পশ্চিমদিক থেকে আসা শুষ্ক গরম হাওয়ায় মাঠঘাট ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে।

উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহে নিয়োজিত নর্দান ইলেকট্রিসিটি ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (নেসকো) সূত্রে জানা গেছে, পাওয়ার গ্রিড থেকে অঞ্চলের চাহিদার অর্ধেকের কিছু বেশি পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ আসছে। নেসকো শুধু উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ছোট ও বড় শহর এলাকাগুলোয় বিদ্যুৎ বিতরণ করে থাকে। অন্যদিকে গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোয় ২০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি গ্রামীণ জনপদে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। এসব সমিতির প্রতিটির চব্বিশ ঘণ্টার চাহিদা ১২০ থেকে ১৫০ মেগাওয়াট। কিন্তু সমিতিগুলো চাহিদার বিপরীতে পাচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ মেগাওয়াট।

এদিকে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর গ্রামাঞ্চলে দিনরাত ৪০ থেকে ৫০ ভাগ বিদ্যুৎ কম সরবরাহ হচ্ছে জানা গেছে। ফলে গ্রামাঞ্চলে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। এ বিষয়ে রাজশাহী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার রমেশ চন্দ্র রায় জানান, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কিছুটা কম আছে। রাজশাহী পবিস এলাকায় ২০ থেকে ৩০ ভাগ কম বিদ্যুৎ সরবরাহ আসছে। লোডশেডিং থাকলেও ততটা তীব্র নয়। দিনরাত ২৪ ঘণ্টায় ২ থেকে ৩ ঘণ্টা লোড ম্যানেজমেন্ট করতে হচ্ছে। সেচ এলাকাগুলোয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ দেওয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহী ও রংপুর জোনের ১৬ জেলার বড় ও ছোট শহরগুলোয় বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে নেসকো। নেসকোর রাজশাহী জোনের আট জেলায় দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা ১ হাজার ৩৭৭ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে ৭৫০ থেকে ৮০০ মেগাওয়াট। একইভাবে রংপুর জোনের দৈনিক চাহিদা ১ হাজার ৫০ থেকে ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ আসছে ৬৫০ থেকে ৭০০ মেগাওয়াট। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) বগুড়া নিয়ন্ত্রণ কক্ষ সূত্রে জানা যায়, উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় বিদ্যুতের গড় চাহিদা ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট। কিন্তু সরবরাহ হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট। ফলে লোড ম্যানেজমেন্ট হচ্ছে। পিজিসিবির গ্রিড নিয়ন্ত্রণ কক্ষের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মূলত জ্বালানি তেলের অভাবে উত্তরাঞ্চলের বেশির ভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন কমায় লোডশেডিং বেড়ে গেছে। বিতরণ প্রতিষ্ঠান পবিস বা নেসকোর কিছু করার নেই। তারা কম সরবরাহ পাচ্ছে। তবে লোডশেডিং ৩০ ভাগের মধ্যে সীমিত রাখতে সরকারের ঊর্ধ্বতন মহল থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এদিকে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, দেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ১৫ হাজার ৫৯৮টি গভীর নলকূপ সেচকাজে নিয়োজিত আছে। এসব নলকূপ অধিকাংশই বিদ্যুৎচালিত। তবে বিদ্যুৎ সংকটে বিএমডিএ অর্ধেক গভীর নলকূপ চালাতে পারছে না। আবার ২৪ ঘণ্টায় এসব গভীর নলকূপ ১৪ ঘণ্টা চালানোর নিয়ম থাকলেও বর্তমানে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টার বেশি চালানো যাচ্ছে না। বিএমডিএ-এর এসব নলকূপের সেচের আওতায় রয়েছে ৬ লাখ ২৯ হাজার হেক্টর ফসলি জমি। বর্তমানে আড়াই লাখ হেক্টর জমিতে বোরো ধান রয়েছে। বোরো ফসল পুরোটাই সেচনির্ভর। বিএমডিএ-এর সেচ বিভাগের একজন প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বোরো ফসল বাঁচাতে একদিন পরপর জমিতে সেচ দেওয়ার নিয়ম। কিন্তু বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সাত দিনেও একদিনও সেচ পাচ্ছেন না কৃষক। এতে জমিতেই শুকিয়ে যাচ্ছে বোরো ফসল।

রাজশাহীর বাগমারার কৃষক সাইফুল ইসলাম বলেন, বোরো খেতে এখন শিষ দেখা দিচ্ছে। এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে তিন ঘণ্টা থাকছে না। ডিজেল দিয়ে সেচযন্ত্রগুলো চালানোর চেষ্টা করছি। কিন্তু কোনো পাম্পে গিয়ে ডিজেল মিলছে না। আমরা ভীষণ বিপদে আছি। ফসল বাঁচানোর কোনো উপায় দেখছি না। খরতাপের কারণে জমি ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। গোদাগাড়ীর গভীর নলকূপ অপারেটর আবদুর রহমান জানান, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। তাপপ্রবাহের কারণে জমি শুকিয়ে যাচ্ছে। রাতে জমিতে পানি দিলে দুপুরের মধ্যেই শুকিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বিদ্যুৎ না পাওয়ায় আমরাও কিছুই করতে পারছি না। খাড়ি-নালা থেকে ছোট সেচ পাম্পের মাধ্যমে পানি তুলে জমিতে দিতে ডিজেলের দরকার। সেই ডিজেলও মিলছে না কোথাও।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক সাবিনা বেগম জানান, বোরো খেতে এখন শিষ দেখা দিচ্ছে। এই সময়ে সেচ দিতে না পারলে ধান চিটা হবে। এতে বোরো ফলনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। মোট উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হলে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে। তিনি আরও জানান, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট সেচ ব্যবস্থাপনাকে আরও জটিল করে তুলেছে, বিশেষ করে ডিজেলচালিত সেচ পাম্পের ওপর নির্ভরশীল কৃষকরা বেশি সমস্যায় পড়ছে।

Facebook Comments Box

No tags found for this post.

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নিত্যপণ্যের সঙ্গে লাগামহীনভাবে ব্যবহার্যপণ্যের দাম বাড়ানোর নেপথ্যে কারা?

বিভিন্ন দেশের কারাগারে ১০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি বন্দি: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

রুমিন আপার মধ্যে শেখ হাসিনার ছায়া দেখা যায়: রাশেদ খাঁন

ড. ইউনূসের গ্রামীণ কল্যাণের ৬৬৬ কোটি টাকা বকেয়া কর পরিশোধ করতে হবে : হাইকোর্ট

ব্যালন ডি’অরে রোনালদোর গড়া ২টি রেকর্ড ভেঙে দিলেন মেসি

মাদক, হতাশা ও সুস্থ বিনোদনের অভাবে বাড়ছে চুরি, ছিনতাই, সহিংসতার মত বিভিন্ন অপরাধ

থার্ড টার্মিনাল চালু ১৬ ডিসেম্বর, পরিবর্তন হচ্ছে না বিমানবন্দরের নাম

আজ জাতিসংঘ অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব নেবেন খলিলুর রহমান

সংসদে আইন পাস, সম্পত্তি দানের পরও আজীবন ভোগ করতে পারবেন দাতা

আসন্ন উপজেলা নির্বাচনের বিধিমালায় পোস্টার-মিছিল নিষিদ্ধ

১০

যানজট নিরসনে ঢাকার ৪ টার্মিনাল দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে

১১

রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দুদিনের সফরে আজ ঠাকুরগাঁও যাচ্ছেন

১২

নো গ্যাস নো বিল, নো সার্ভিস নো ট্যাক্স: রুমিন ফারহানা

১৩

কারাবন্দিরা স্বজনদের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলতে পারবেন

১৪

সরকার জনগণের সঙ্গে ভাঁওতাবাজি করছে: জামায়াত আমির

১৫

বদলে গেছে জমির নামজারির নিয়ম, জেনে নিন নীতিমালা

১৬

রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলকে বরণে ঠাকুরগাঁওয়ে উৎসবের আমেজ

১৭

জামালপুর-ঢাকা বাস চলাচল বন্ধ, চরম ভোগান্তিতে যাত্রীরা

১৮

বেনজীর আহমেদের অবস্থান জানতে ইন্টারপোলকে পুলিশের চিঠি

১৯

সাহায্য নয়, ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ক্ষতিপূরণ চায় নেপাল

২০