
বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে সবগুলোই সমান গুরুত্বের হলেও, কিছু আসনকে ঘিরে ডালপালা মেলেছে বিচিত্র সব রাজনৈতিক মিথ। গত কয়েক দশকের সংসদীয় নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সিলেট-১ এবং সিরাজগঞ্জ-৫ আসন দুটি যেন বাংলাদেশের ক্ষমতার অলিখিত চাবিকাঠি। রাজনৈতিক বিশ্লেষক থেকে শুরু করে সাধারণ ভোটার—সবার মধ্যেই এই বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়েছে যে, এই দুটি আসনে যারা হাসেন শেষ হাসি, তারাই বসেন রাষ্ট্র পরিচালনার সিংহাসনে।
সিলেট-১ আসনটি হযরত শাহ জালাল (রঃ) পুন্যভুমি আধ্যাতিক রাজধানী ও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু খ্যাত বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘মর্যাদাপূর্ণ’ ও ‘পয়া’ আসন হিসেবে পরিচিত এবং প্রতিটি নির্বাচনে এই আসনের জয়ী দলই সরকার গঠন করেছে অন্যদিকে সিরাজগঞ্জ-৫ আসনটিও হযরত খাজা ইউনুছ আলী (রঃ) এর আশীর্বাদতুষ্ট এনায়েতপুর পুন্যভুমিও সিলেট-১ আসনের মতোই ‘লাকি চার্ম’ হিসেবে কাজ করে। যমুনা বিধৌত এই অঞ্চলের ভোটারদের রায় যেন বঙ্গভবনের প্রবেশের পথ ঠিক করে দেয়।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, সিলেট-১ আসনটিতে ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগের আব্দুল হেকিম চৌধুরী বিজয়ী হন এবং আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে, ১৯৭৯ সালে বিএনপির সৈয়দ রফিকুল হক বিজয়ী হন এবং বিএনপি সরকার গঠন করে, ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী বিজয় হলে জাতীয় পার্টি সরকার গঠন করে, ১৯৯১ ও ফেব্রুয়ারী ১৯৯৬ সালে বিএনপির খন্দকার আব্দুল মালিক বিজয়ী হন এবং বিএনপি সরকার গঠন করে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী বিজয়ী হলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। ২০০১ সালে এম সাইফুর রহমান (বিএনপি) এবং ২০০৮ ও ২০১৪ সালে আবুল মাল আবদুল মুহিত (আওয়ামী লীগ) ২০১৮ ও ২০২৪ সালে আবুল কালাম আব্দুল মোমেন (আওয়ামী লীগ) বিজয়ী হওয়ার পর তাদের নিজ নিজ দল সরকার গঠন করে।
সর্বশেষ চিত্রে সদ্য সমাপ্ত ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, বিএনপির খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বড় ব্যবধানে এগিয়ে আছেন এবং দেশজুড়ে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছে।
অপরদিকে যমুনাতীরের সিরাজগঞ্জ-৫ আসনটিও যেন বাংলাদেশের সাংসদীয় ক্ষমতার নির্ধারক হিসেবেই প্রতিয়মান। পরিসংখ্যানে দেখা যায় ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে যথাক্রমে জাতীয় পার্টির মফিজউদ্দিন ও শহিদুল ইসলাম খান সাংসদ নির্বাচিত হন সে সময়কালে রাষ্ট্র পরিচালনায় ছিলেন জাতীয় পার্টি, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ এর ফেব্রুয়ারীতে এই আসনে বিএনপির সহিদুল্লাহ খান বিজয়ী হন, সরকার গড়ে বিএনপি। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের আব্দূল লতীফ বিশ্বাস বিজয়ী হন, সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ, ২০০১ সালে বিএনপির মোজাম্মেল হক বিজয়ী হলে সরকার গঠন করে বিএনপি এবং ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের আব্দুল লতিফ বিশ্বাস. ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের আব্দল মজিদ মন্ডল, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের আব্দুল মমিন মন্ডল বিজয়ী হলে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। প্রতিবারই এই আসনের বিজয়ী দলের প্রধানরা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন।
সর্বশেষ ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির আমিরুল ইসলাম খান আলীম বিজয়ী হয়েছেন এবং বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্টায় সরকার গঠন করছেন। বিশ্লেষণে দেখা যায়, যখনই এই আসনে ধানের শীষ বা নৌকা প্রতীকের পাল্লা ভারি হয়েছে, কেন্দ্রীয় রাজনীতিতেও তার প্রতিফলন ঘটেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে নিশ্চয় অলৌকিক শক্তির আশীর্বাদ ও কিছু কৌশলগত ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে। যদিও রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই, তবুও সিলেট-১ এবং সিরাজগঞ্জ-৫ আসনের এই জয়যাত্রার রেকর্ড বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির এক অনন্য অলঙ্কার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে আবারও প্রমাণিত হতে যাচ্ছে যে, মসনদের যাওয়ার রাস্তা এই দুই অঞ্চলের সবুজ প্রান্তর আর যমুনার চর দিয়েই নির্মিত হয়। ভোটারদের রায় এবং ক্ষমতার এই অদ্ভুত মিল কি শুধুই কাকতালীয়, নাকি কোনো গাণিতিক বাস্তবতা। তবে আপাতত জনমনে এই বিশ্বাসটিই উজ্জ্বল যে, ‘সিলেট-১ ও সিরাজগঞ্জ-৫ যার, সংসদও তার।
মন্তব্য করুন