
রমজান মাসকে কেন্দ্র করে মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর একটি ঐতিহাসিক খুতবা ইসলামী চিন্তাধারায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে আসছে। হাদিসটি শুয়াবুল ইমান গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। হাদিস বিশারদ ইমাম নববী ও ইমাম সুয়ূতি এ বর্ণনাকে গ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করেছেন। যদিও এর সনদ নিয়ে কিছু মুহাদ্দিসের মধ্যে মতভেদ রয়েছে, তবু এর বিষয়বস্তু কোরআন ও সহিহ হাদিসসমূহের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে আলেমরা মত দিয়েছেন।
খুতবার শুরুতেই রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেন—এক মহান ও বরকতময় মাস মানুষের ওপর ছায়া বিস্তার করতে যাচ্ছে। এ মাসে রয়েছে এমন এক রজনি, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম—লাইলাতুল কদর। কোরআনের সূরা আল-কদরে এই রাতের মর্যাদা স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে।
তিনি বলেন, রমজানে দিনের বেলা রোজা ফরজ করা হয়েছে এবং রাতের ইবাদত নফল। এ মাসে নফল ইবাদত অন্য সময়ের ফরজের সমপর্যায়ের সওয়াব লাভ করে এবং একটি ফরজ আদায় করলে সত্তর ফরজের সমান প্রতিদান পাওয়া যায়—এমন বর্ণনাও হাদিসটিতে এসেছে। আলেমরা ব্যাখ্যা করেছেন, এটি আমলের মর্যাদা ও আন্তরিকতার বহুগুণ বৃদ্ধির প্রতি ইঙ্গিত বহন করে।
খুতবায় রমজানকে ‘শাহরুস সবর’—ধৈর্যের মাস—হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। রোজা মানুষকে ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণের প্রশিক্ষণ দেয়। হাদিসে বলা হয়েছে, ধৈর্যের প্রতিদান জান্নাত।
এ মাসকে ‘শাহরুল মুওয়াসাত’—সহমর্মিতার মাস—হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। রোজা ধনী-গরিবের ব্যবধান কমিয়ে অভাবীদের কষ্ট অনুভব করতে শেখায়। ফলে সমাজে দান, সদকা ও পারস্পরিক সহযোগিতার মানসিকতা বৃদ্ধি পায়।
বিশেষভাবে রোজাদারকে ইফতার করানোর ফজিলতও খুতবায় তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, একটি খেজুর, এক ঢোক পানি বা সামান্য দুধ দিয়েও ইফতার করালে রোজাদারের সমপরিমাণ সওয়াব পাওয়া যায়—রোজাদারের সওয়াব কমানো ছাড়াই। এতে ইসলামে নিয়ত ও আন্তরিকতার গুরুত্ব প্রতিফলিত হয়।
হাদিসে রমজানের তিন দশকের কথাও উল্লেখ রয়েছে—প্রথম দশক রহমত, দ্বিতীয় দশক মাগফিরাত এবং শেষ দশক জাহান্নাম থেকে মুক্তি। যদিও সহিহ সূত্রে এ বিভাজন সরাসরি পাওয়া যায় না বলে কিছু গবেষক মত দিয়েছেন, তবে ইসলামী বয়ানে এটি ব্যাপকভাবে প্রচলিত এবং আধ্যাত্মিক অনুশীলনের দিকনির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হয়।
খুতবার শেষাংশে চারটি আমলের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—
কালিমা শাহাদাত অধিক পাঠ
বেশি বেশি ইস্তিগফার
জান্নাত প্রার্থনা
জাহান্নাম থেকে আশ্রয় প্রার্থনা
গবেষকদের মতে, এ চারটি আমল ঈমান, তাওবা, আশা ও ভয়ের ভারসাম্যপূর্ণ চর্চার প্রতিফলন।
ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, এই খুতবা স্পষ্ট করে দেয়—রমজান কেবল খাদ্য ও পানীয় বর্জনের মাস নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, নৈতিকতা, সামাজিক দায়িত্ব ও আল্লাহমুখী জীবনের প্রশিক্ষণকাল। মিথ্যা, গীবত, কটু বাক্য, অন্যায় দৃষ্টি ও দুর্নীতি থেকে বিরত না থাকলে রোজার প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ হয় না।
আজকের সমাজে রমজানকে আনুষ্ঠানিক ইবাদতে সীমাবদ্ধ না রেখে নৈতিক বিপ্লবের মাসে পরিণত করার আহ্বান জানিয়েছেন আলেমরা। যথাযথভাবে এ মাসকে কাজে লাগাতে পারলে রমজান হতে পারে গুনাহমুক্ত জীবন ও চিরস্থায়ী সফলতার সোপান।
মন্তব্য করুন