
প্রোপাগান্ডার আড়ালে ইরান
আশিক মোস্তফা
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি নিয়ে যে বয়ান বিশ্বমাধ্যমে প্রচারিত হয়, তা অনেকাংশেই একপেশে সরলীকৃত ইমেজ। সেখানে রাষ্ট্রগুলোকে দেখা হয় কেবল ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, যুদ্ধ বা নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপটে। কিন্তু কিছু দেশ, কিছু জাতি আছে যাদের কেবল রাজনীতির ভাষায় বা বাহ্যিক বিচারে বোঝা সম্ভব না। যেমন ইরান, তথা পারস্য সাম্রাজ্য। তাদের ভেতরে লুকিয়ে আছে বহু শতাব্দীর সভ্যতা, আধ্যাত্মিকতা, কাব্যময়তা ও সাংস্কৃতিক স্মৃতি। ইরানকে ঘিরে সমসাময়িক বিতর্ক বিশেষত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তার শাসনামল নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনাও এই জটিল বাস্তবতারই প্রতিফলন। কারও কাছে তিনি কঠোর শাসনের প্রতীক, কারও কাছে প্রতিরোধের প্রতীক। কিন্তু এই দ্বৈততার ভেতরে রয়েছে আরও গভীর একটি সত্য – বহির্বিশ্বের উদ্দেশ্যমূলক অপপ্রচার বা প্রোপাগান্ডা। ইরানকে বোঝার জন্য সংবাদ শিরোনামের বাইরে যেতে হয়, ইতিহাসের গভীরে তাকাতে হয়। কারণ ইরান কেবল একটি রাষ্ট্র নয়; এটি একটি দীর্ঘ সভ্যতার অখণ্ড ধারাবাহিকতা। বিশ্বাসীদের জন্য এক রুহানি সিলসিলা।
বর্তমানের এই ইরান সেই জনপদেরই অংশ যেখানে সুফি মরমীবাদ তার পূর্ণ বিকাশ লাভ করেছিল বিশেষত ইরান, খোরাসান, মধ্য এশিয়া ও আনাতোলিয়ায়। এখানেই সুফিবাদ একটি গভীর দর্শন, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ধারায় পরিণত হয়। ইসলামের ইতিহাসকে যদি কেবল আইন, ফতোয়া ও রাজনৈতিক সংঘর্ষের ইতিহাস হিসেবে দেখা হয়, তাহলে তার সবচেয়ে গভীর স্তরটিই অদৃশ্য থেকে যায়। কারণ ইসলামের জন্মের ভেতরে ছিল এক আধ্যাত্মিক বিপ্লব একটি অন্তর্জাগরণের আহ্বান। সেই আহ্বান ছিল মানুষকে কেবল একটি ধর্মীয় পরিচয়ের অধীনে আনা নয়, বরং তাকে নিজের অন্তরের নূর আবিষ্কার করতে শেখানো, একটা আত্মিক যাপনে অভ্যস্ত করা।
ইসলাম, ইসলামি বিশ্ব, এর ইতিহাস ও ঐতিহ্য এতটাই বৈচিত্রময় যে কোন একতরফা দৃষ্টিভঙ্গিতে তা বিচার করা যাবে না। শুধু বস্তুবাদী আর যুক্তিবাদী চিন্তা থেকে দেখলে বোঝা যাবে না ইসলামের তাৎপর্য কিংবা ইরানের রুহানী শক্তি। একটা দেশ জাতি ধর্মকে যুক্তি তর্ক দিয়ে বুঝতে চাওয়াটাই বস্তুবাদীতা।
একটা পরাশক্তি যারা সারা বিশ্বকে অস্থির করে রেখেছে, যারা যখন ইচ্ছা একটা দেশের প্রেসিডেন্টকে তুলে আনতে পারে, যাকে যখন ইচ্ছা হত্যা করতে পারে, যে কোন দেশকে গাজায় পরিণত করতে পারে, সারা বিশ্ব জুড়ে অনাচার করে যাচ্ছে সেই সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে যারা এককভাবে মুসলিম বিশ্বের একটা ব্যালান্স ধরে রেখেছে, যারা ইসলামের অস্তিত্বের জন্য প্রায় একাই মোকাবেলা করছে তাদেরকে কট্টরপন্থী বলে বা নারী স্বাধীনতা ও হিজাবের মতো আপাত তুচ্ছ ও প্রশ্নসাপেক্ষ কিছু ইস্যুতে ঘায়েল করা বা দমিয়ে রাখা যাবে না!
পশ্চিমা মিডিয়ায় ইরানকে প্রায়শই একটি সরলীকৃত ইমেজে উপস্থাপন করা হয় একটি সংকীর্ণ সমাজ, যেখানে ধর্মীয় কর্তৃত্ব সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং জনগণ সর্বদা দমিত ও নিপীড়িত। বাস্তবতা অবশ্য অনেক বেশি ভিন্ন ও জটিল। ইরান মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে শিক্ষিত ও আধুনিক সমাজগুলোর একটি; বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিল্প, সাহিত্য, সিনেমা এবং বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষায় দেশটির অগ্রগতি ব্যাপক এবং তাতে নারীদের অংশগ্রহণ অনেকাংশেই বেশি বা সমান। শক্তিশালী নাগরিক বিতর্ক, রাজনৈতিক মতভেদ এবং সামাজিক আলোচনার দীর্ঘ ঐতিহ্যও আছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক আলোচনায় এই সূক্ষ্ম সামাজিক বাস্তবতাগুলো প্রায়ই হারিয়ে যায়। প্রায়শই ইরানকে বিচার করা হয় বাহ্যিক প্রতীকের ভিত্তিতে যেমন পোশাক বা ধর্মীয় আচারের মাধ্যমে যেখানে ইতিহাসের গভীরতা ও সামাজিক প্রেক্ষাপট উপেক্ষিত থাকে।
ইরানকে বোঝার ক্ষেত্রে মূল সমস্যার বিষয় হলো তথাকথিত নেটিভ বা দেশীয় সমাজকে দেখার পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি। উপনিবেশ-পরবর্তী অনেক সমাজের ক্ষেত্রে একটি দ্বৈত মানদণ্ড কাজ করে: তারা হয় পশ্চিমা ধাঁচে সম্পূর্ণ আধুনিক হবে, নয়তো সম্পূর্ণ পশ্চাৎপদ ও অযৌক্তিক হিসেবে চিত্রিত হবে। মাঝখানের জটিল বাস্তবতা যেখানে একটি সমাজ নিজস্ব ঐতিহ্য, ধর্মীয় সংস্কৃতি এবং আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে একসঙ্গে ধারণ করার চেষ্টা করে সেটি প্রায়ই এই বয়ানে অদৃশ্য হয়ে যায়। ইরানের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যায়: দেশটি যদি পশ্চিমা সামাজিক মানদণ্ড পুরোপুরি গ্রহণ না করে, তবে তাকে সহজেই ব্যাকডেটেড বা অসভ্য বলে চিহ্নিত করা হয়। অথচ বাস্তবে অনেক সমাজই আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের মধ্যে নিজস্ব সমন্বয় তৈরি করার চেষ্টা করে ইরানের অভিজ্ঞতাও তার ব্যতিক্রম নয়।
এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিজাব প্রশ্ন। সাধারণ ধারণা হলো ইরানে হিজাব কেবল রাষ্ট্রের আরোপিত নিয়ম। কিন্তু ইতিহাস একটু ভিন্ন গল্প বলে। শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির আমলে, বিশেষত বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে, পশ্চিমাকরণের নীতির অংশ হিসাবে হিজাব নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল এবং অনেক ক্ষেত্রে নারীদের তা খুলতে বাধ্য করা হতো। কিন্ত ইরানে হিজাবের প্রচলন ইসলাম আসার আগে থেকেই, পোশাক-ঐতিহ্যের অংশ হিসাবে বহু বিচিত্র হিজাবের প্রচলন সেখানে বহুকাল ধরেই। তো শাহর আমলে যখন আধুনিকতার নামে হিজাব তুলে দেয়ার চেষ্টা হয়েছে অগণিত নারী তখন হিজাব পরার অধিকার রক্ষার জন্য রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করে। ফলে ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের সময় হিজাব কেবল ধর্মীয় প্রতীক ছিল না; এটি সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য এবং রাজনৈতিক প্রতিরোধেরও প্রতীক হয়ে ওঠে।
একইভাবে পুরুষদের পোশাকের ক্ষেত্রেও শাহের সময় পশ্চিমা পোশাক—বিশেষ করে স্যুট ও নেকটাই আধুনিকতার প্রতীক হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বিপ্লব-পরবর্তী সমাজে সেই অতিরিক্ত পশ্চিমাকরণের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াও দেখা যায়, নেকটাই নিষিদ্ধ হয়। এইসব বিষয় অনেক সময় বাইরের পর্যবেক্ষণে সরলভাবে পশ্চাৎপদতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, অথচ এর পেছনে রয়েছে আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য এবং রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার দীর্ঘ ইতিহাস।
ইরান তো আরব না, ইরানে মানুষ হিজাব পড়ে, ফ্যাশনেবল বোরকা পড়ে, কিন্তু আরব ও তালেবানদের মত মুখচোখ ঢেকে কিম্ভূতকিমাকার অস্বাভাবিক কিছু সাজে না । যেখানে মেয়েদেরকে সম্পূর্ণ আবৃত করে বাইরের সমাজ থেকে সম্পূর্ণ অদৃশ্য ও পরিচয়হীন করে ফেলা হয়। কিন্তু ইরানে বরং অন্য অনেক দেশের তুলনায় মেয়েরা নিজেদেরকে অনেক বেশি সুন্দর ও আকর্ষণীয় করে তোলে। হিজাব তাদের সৌন্দর্য্য চর্চায় শেষপর্যন্ত তেমন বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। তালেবানদের মতো ইরানে মেয়েদের মুখ ঢাকা বাধ্যতামূলক নয়। এমনকি খামেনীর মৃত্যুর পর অসংখ্য মহিলারা যে মাতম করেছে, তাদের কারোই মুখ ঢাকা না, সবার চেহারাই দৃশ্যমান। সবচেয়ে বড় কথা ইরানের মেয়েদের দমন করা সহজ না, ঐতিহ্যগতভাবেই তাদের মতো মাতৃপ্রধান, শক্ত, স্বনির্ভর ও নারীবাদী নারী সমাজ খুব কম দেশেই আছে- খামেনির আমলেই যে পরিমাণ ফেমিনিস্ট তৈরি হয়েছে ইরানে পশ্চিমা দেশেও তা বিরল। ইরানে যে পরিমাণ নারী ফিল্মমেকার, নারী কবি-সাহিত্যিক-আর্টিস্ট, বিজ্ঞানী উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আছে খুব কম দেশেই তা আছে। ইরানকে সৌদি আরবের মতো নারী-পরিপন্থী দেশ হিসাবে কল্পনা করলে তাদের সামাজিক ভারসাম্য ও অন্তর্নিহিত বিষয়গুলো বোঝা যাবে না। যে কোন মুসলিম দেশের চেয়ে ইরানি মেয়েরা বহুগুণ এগিয়ে- তাদের ক্যারিয়ার, সফলতা, লাইফস্টাইল সব দিক থেকে।
শিয়াদের পক্ষে চাইলেও ওহাবী-সালাফি চরমপন্থীদের মতো কট্টর হওয়া সম্ভব না – কারণ তারাও সুফিদের মত নবী ও আহেলি বায়েতদের ভালোবাসে ও মানে, আধ্যাত্মবাদকে তারা শরিয়তের থেকে পুরোপুরি বাদ দেয় না। ইরানের কট্টর পন্থাও তাই অনেক বেশি ভারসাম্যপূর্ণ এবং উদার, অনেকটাই সুফি ধারার- খুব কম বিষয়েই আরবের চরম পন্থীদের সাথে মিল। ইরানে নারী নেতৃত্ব, নারী ফিল্মমেকার, গায়িকা, গান বাজনা কোন কিছুতেই কোন বাধা নাই, বরং এসবের চর্চা ও সংখ্যা অনেক দেশের চেয়েই বেশি। অনেক মুসলিম দেশে যেখানে গান-বাজনা, সিনেমা এসবকে হারাম বলে ফতোয়া দেয়া হয়, সেখানে ইরানের সরকারি অনুদানেই প্রতি বছর যে পরিমাণ সিনেমা তৈরি হয় তা অবিশ্বাস্য- সিনেমা দিয়ে তারা বিশ্ব জয় করেছে; ধর্মীয় উদারতার দিক থেকে তারা বাংলাদেশ-পাকিস্তানের মতো মধ্যপন্থী মুসলিম দেশগুলোর চেয়েও বহুগুণ বেশি প্রগতিশীল ও উদার। ইরানকে কেবল পশ্চিমা বিশ্বের প্রোপাগান্ডা বা অপপ্রচার দিয়ে বিচার করা দেশটার প্রতি চরম অবিচারই।
কিন্তু সেটাই অহরহ করা হয়, ইরানকে প্রায়ই একতরফা ধর্মীয় রাষ্ট্র হিসাবে কল্পনা করা হয়, যদিও বাস্তবে দেশটি ধর্মীয় ও জাতিগত বৈচিত্র্যে ভরপুর। রাষ্ট্রধর্ম শিয়া ইসলাম হলেও এখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সুন্নি মুসলিম রয়েছে, পাশাপাশি খ্রিস্টান, ইহুদি এবং জরথুস্ত্রীয় সম্প্রদায়ের মানুষও শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বসবাস করছে। জাতিগত দিক থেকেও ইরান এক বিস্ময়কর বৈচিত্র্যের দেশ। পারসিক জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি আজেরি, কুর্দি, লুর, বেলুচি, আরব, তুর্কমেন, গিলাকি, মাজান্দারানি, তালিশসহ নানা জনগোষ্ঠী এই রাষ্ট্রের সামাজিক রূপকে নির্মাণ করেছে। ভাষা, সংস্কৃতি ও আঞ্চলিক ঐতিহ্যের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও এই জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে রয়েছে এক গভীর ঐতিহাসিক সংযোগ যা পারস্য সভ্যতার দীর্ঘ ধারায় গড়ে ওঠা। ধর্মীয় ক্ষেত্রেও ইরানের বাস্তবতা একমাত্রিক নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়ারা মূলত ইছনা আশারিয়া বা দ্বাদশবাদী মতবাদের অনুসারী হলেও শিয়া ইসলামের মধ্যেও নানা ধারা রয়েছে উসুলি শিয়া, আখবরি শিয়া, ইসমাইলি, যায়েদি কিংবা বিভিন্ন সুফি প্রভাবিত আধ্যাত্মিক ধারা। পাশাপাশি বহু শিয়ার ধর্মীয় চর্চায় মাজার সংস্কৃতি, অলি-আউলিয়ার প্রতি ভক্তি, এবং আশুরার শোকানুষ্ঠানের মতো আচার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে ইরানে ইসলাম কেবল শরিয়তের বিধান হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি গভীর সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক যাপন হিসেবেও উপস্থিত।
সমসাময়িক ইরান তাই একটি জটিল সমীকরণের শিকার। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর দেশটি একটি শিয়া ধর্মীয় রাষ্ট্রে পরিণত হয়, যার রাজনৈতিক কাঠামো মূলত বেলায়াতে ফকিহ তত্ত্বের উপর দাঁড়ানো ইসলামিক আইনী শাসন। তবে একই সাথে পারস্যের সুফি ঐতিহ্যও সমাজের সাংস্কৃতিক ও মানসিক জীবনে গভীরভাবে উপস্থিত। আজও ইরানের মানুষের দৈনন্দিন জীবনে রুমীর কবিতা, হাফিজের গজল, আত্তারের কাহিনি এবং মরমি সংগীত গুরুত্বপূর্ণ স্থান ধরে রেখেছে। এমনকি অনেক কট্টর ধর্মীয় আলেমও সুফি সাহিত্য দ্বারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রভাবিত। ফলে ইরানের বাস্তবতা দ্বৈত একদিকে রাষ্ট্রিক ধর্মীয় কাঠামো, অন্যদিকে গভীর সাংস্কৃতিক সুফি ঐতিহ্য।
এই সুফিবাদী মরমী আধ্যাত্মিকতাই ইরানের ইতিহাসে সবচেয়ে গভীর প্রভাব ফেলেছে। পরবর্তীতে ইসলামের শক্ত আইনি অনুশাসন ও ফিকহ কাঠামো তৈরি হলেও শুরুতে এ অঞ্চলে একটা মারেফতি ইসলামেরই বিকাশ ঘটেছিল, যেখানে ধর্মকে দেখা হয় আত্মজিজ্ঞাসা, প্রেম এবং নূরের অনুসন্ধানের পথ হিসেবে। পারস্য সংস্কৃতিতে আগে থেকেই মরমী দর্শনের একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য ছিল। বাংলাদেশ সহ ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলের মতোই। তবে উচ্চতার বিচারে ইরানে ইসলামের বিকাশ স্পেনের আন্দালুসিয়ার স্বর্ণযুগের সাথে তুলনাযোগ্য। পারস্য উপসাগর তীরে ইসলাম আসার পর সেই সাংস্কৃতিক মাটিতে সুফি তাসাউফের উর্বরা বীজ রোপিত হয় এবং ধীরে ধীরে পরিণত হয় এক অসাধারণ আধ্যাত্মিক জাগরণে। এই পরিবেশ থেকেই জন্ম নেন ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী বহু মরমি কবি, দার্শনিক, শায়েখ, মাওলানা ও চিন্তাবিদরা। পুরো জনপদকে একটা মরমী রেনেসাঁ এনে দিয়েছেন জালাল উদ্দিন রুমি, শামস তাবরেজি, ফরিদউদ্দিন আত্তার, হাফিজ, ইমাম আল-গাজ্জালির মত সুফি সাধক ও বিজ্ঞজন। তাদের রচনায় ইসলাম এক নতুন ভাষা পায় প্রেমের ভাষা, সৌন্দর্যের ভাষা, আত্মজ্ঞান ও ঐক্যের ভাষা সর্বোপরি এক গভীর মরমী ভাষা। রুমীর কবিতায় মানুষ এক অনন্ত যাত্রার পথিক; আত্তারের কাহিনিতে আত্মা সত্যের সন্ধানে এক রহস্যময় অভিযাত্রায় বেরিয়ে পড়ে; হাফিজের গজলে ঈশ্বরের প্রেম এক অতল সৌন্দর্যের অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে। রুমী-শামসের প্রেম হয়ে ওঠে মুর্শিদ-প্রেমের এক কালজয়ী প্রতীক। এই সময়কে অনেকেই ইসলামের আধ্যাত্মিক স্বর্ণযুগ বলে মনে করেন।
পারস্যের এই মরমী জাগরণ দ্রুত বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। আনাতোলিয়া, মধ্য এশিয়া, ভারত এবং এই বাংলায়ও তা পৌঁছে যায়। সুফি সাধকেরা ইসলামকে স্থানীয় সংস্কৃতি ও যাপনের সঙ্গে মিলিয়ে দেন। ফলে ইসলাম অনেক অঞ্চলে কেবল বিধানের ধর্ম হিসেবে নয়, বরং প্রেম এবং মানবিকতার যাপিত ভাষায় বিকশিত হয়। এই ধারাই ইসলামের ভেতরে এক গভীর আধ্যাত্মিক সভ্যতার জন্ম দেয়, যার কেন্দ্রগুলোর একটি ছিল পারস্য।
ঐতিহাসিকভাবে শিয়া উলামাদের একটি অংশ সুফি তরিকার প্রতি সন্দেহপ্রবণ ছিল, কারণ সুফি তরিকাগুলো প্রায়ই স্বতন্ত্র আধ্যাত্মিক নেতৃত্বের উপর নির্ভর করে। এই কারণে কিছু সময়ে সুফি গোষ্ঠীর সঙ্গে রাষ্ট্র বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের টানাপোড়েন দেখা গেছে। তবুও সম্পূর্ণভাবে সুফিবাদ দমন করা সম্ভব হয়নি, কারণ এটি ইরানের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। যার কারণে ইরানের ধার্মিক, অধার্মিক, উদার বা কট্টরপন্থী নির্বিশেষে সকলের মধ্যেই কমবেশি একটা সুফি মরমী বোধ কাজ করে, এবং সেটা একটা সাংস্কৃতিক উদযাপনের অংশ হিসাবেই, প্রাত্যহিক আচারের মধ্য দিয়েই।
ইরানের আধুনিক রাষ্ট্রপরিচয়ের ইতিহাসও গভীরভাবে সুফি ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। ষোড়শ শতকে যে সাফাভি সাম্রাজ্য ইরানকে একটি ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক সত্তায় রূপ দেয়, তার সূচনা হয়েছিল মূলত একটি সুফি তরিকা সাফাভিয়া অর্ডার থেকে। আরদাবিলের শায়েখ সাফি আল-দীনের আধ্যাত্মিক খানকা থেকেই ধীরে ধীরে একটি ধর্মীয়-সামাজিক আন্দোলন গড়ে ওঠে, যা পরবর্তীতে রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। ফলে ইরানের রাষ্ট্রচিন্তা ও ধর্মীয় সংস্কৃতির ভেতরে সুফি প্রভাব ঐতিহাসিকভাবেই উপস্থিত; এটি কোনো প্রান্তিক বা বিচ্ছিন্ন ধারার বিষয় নয়।
ইরানের ধর্মীয় কল্পনা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কারবালার প্রতীক অত্যন্ত গভীর। ইসলামের ইতিহাসে ইমাম হোসাইনের আত্মত্যাগ কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; এটি নৈতিক সাহসের এক চিরন্তন প্রতীক। ক্ষমতার সামনে আপস না করে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর যে অবস্থান তিনি নিয়েছিলেন, তা মুসলিম কল্পনায় ন্যায় ও প্রতিরোধের সর্বোচ্চ প্রতীক হয়ে আছে। সুফি দর্শনেও কারবালাকে দেখা হয় এক অন্তর্দর্শনের ভাষা হিসাবে যেখানে বাহ্যিক যুদ্ধের পাশাপাশি মানুষের অন্তরের যুদ্ধও উপস্থিত থাকে। নফস, ক্ষমতা, লোভ ও যতেচ্ছ ভোগের বিরুদ্ধে আত্মার সংগ্রাম ও আত্মত্যাগই সেখানে প্রকৃত কারবালা।
এই প্রতীক ইরানের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, খামেনির শেষ সময়ের আচরণে এক ধরনের সচেতন আত্মত্যাগের ইঙ্গিত ছিল। বলা হয়, সম্ভাব্য বিপদের মুখেও তিনি নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এই ঘটনাকে অনেকে দেখেন এক প্রতীকী সিদ্ধান্ত হিসেবে যেখানে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার চেয়ে ইতিহাসে রেখে যাওয়া বার্তার গুরুত্ব বেশি। সমর্থকদের চোখে এটি ছিল এক ধরনের স্বেচ্ছা-শহীদির প্রস্তুতি; একটা উপলব্ধি যে তার মৃত্যু হয়তো এমন এক আবেগ ও ঐক্যের জন্ম দিতে পারে, যা বিভক্ত সমাজকে আবার একত্র করবে। সমর্থকের কাছে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির অবস্থান প্রতিরোধের ধারার একটি আধুনিক প্রতিফলন যেখানে একজন নেতা নিজেকে কেবল রাষ্ট্রপ্রধান নয়, বরং ইতিহাসের এক দীর্ঘ প্রতিরোধের ধারাবাহিকতার অংশ হিসাবে দেখেন। খামেনির সমর্থকেরা তাকে প্রায়ই এমন একজন নেতা হিসেবে দেখেন যিনি দীর্ঘ দশক ধরে পশ্চিমা চাপ, নিষেধাজ্ঞা এবং কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার মুখেও নিজের অবস্থান বজায় রেখেছেন। তাদের কাছে তিনি শের-এ-ইরান ও শের-এ-ইসলাম যিনি একজন আধ্যাত্মিক নেতা, আবার রাজনীতির ময়দানেও সিংহের মতই সাহসী ও দৃঢ়। সমালোচকেরা অবশ্য এই মূল্যায়নের সঙ্গে একমত নন। কিন্তু যে বিষয়টি অস্বীকার করা কঠিন, তা হলো তার দীর্ঘ রাজনৈতিক উপস্থিতি এবং ইরানের বিপ্লবী রাষ্ট্রব্যবস্থার ধারাবাহিকতায় তার প্রভাব।
খামেনি ও সুফি ঐতিহ্যের প্রতি সহানুভূতি ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো শিয়া ধর্মতত্ত্ব দ্বারা প্রভাবিত হলেও এর ভেতরে আধ্যাত্মিক ধারার উপস্থিতিও অস্বীকার করা যায় না। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বক্তব্য ও লেখায় বহুবার রুমি, হাফেজ কিংবা ইরানি আধ্যাত্মিক দর্শন ও কবিতার উল্লেখ দেখা যায়। যদিও রাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে কিছু সুফি গোষ্ঠীর সঙ্গে মতপার্থক্য রয়েছে, তবু ইরানি বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে সুফি সাহিত্য ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের প্রতি একটি সাংস্কৃতিক সম্মান বজায় রয়েছে। খামেনি নিজেও পারস্যের মরমি কবিতার ঐতিহ্যের প্রতি প্রকাশ্যে শ্রদ্ধা দেখিয়েছেন, যা ইরানি সংস্কৃতির গভীর আধ্যাত্মিক স্তরের ইঙ্গিত দেয়।
এই প্রেক্ষাপটে ইরান প্রশ্নটি কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নয়; এটি বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ। ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলন বহুবার ঘটেছে। এসব আন্দোলনের কারণও বহুমাত্রিক বহির্বিশ্বের ভূ-রাজনীতি, অর্থনৈতিক চাপ, রাজনৈতিক মতভেদ, কুর্দি জনগোষ্ঠীর বিভেদ, বেলুচি অঞ্চলের অস্থিরতা, তরুণ প্রজন্মের উপর পশ্চিমা প্রভাব ও সামাজিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা এই সব কিছু মিলেই সেখানে এক জটিল বাস্তবতা তৈরি করেছে। পাশাপাশি বামপন্থী, সেকুলার ও নৈরাজ্যবাদী রাজনৈতিক ধারা তরুণ সমাজে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোও ইরানের অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করে।
ইরান বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সম্পদের অধিকারী। মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত অবস্থান, জ্বালানি সম্পদ এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতে তার প্রভাবের কারণে দেশটি দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে রয়েছে। ফলে ইরানকে ঘিরে তথ্যযুদ্ধ ও প্রচারযুদ্ধও একটি বিরূপ বাস্তবতা। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই ইরানকে একটি সরলীকৃত ছবিতে উপস্থাপন করা হয়, যেখানে তার সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক জটিলতা অনেক সময় অনুপস্থিত থাকে।
ইরানকে বোঝা মানে তাই কেবল রাজনীতিকে বোঝা নয়; বরং একটি সভ্যতাকে বোঝা। এখানে ইসলাম কেবল আইন নয় কবিতা, প্রেম, দর্শন ও আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে মিশে একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক রূপ ধারণ করেছে। পারস্যের এই ঐতিহ্য ইসলামের এক অনন্য রূপ তৈরি করেছে, যা আরব বিশ্বের ধর্মীয় সংস্কৃতির তুলনায় অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্ন এবং স্বতন্ত্র।
এই কারণেই ইরানকে ঘিরে বিতর্ক শেষ হয় না। কারণ এই দেশটি একই সঙ্গে বহু স্তরের বাস্তবতা বহন করে ধর্মীয় রাষ্ট্র, আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য, রাজনৈতিক প্রতিরোধ, বহুজাতিক সংস্কৃতি এবং দীর্ঘ সভ্যতার স্মৃতি। ইরান মূলত একটি দীর্ঘ ইতিহাসের নাম যেখানে বিশ্বাস, সংস্কৃতি, প্রতিরোধ এবং আধ্যাত্মিকতা একসঙ্গে প্রবাহিত হয়েছে। এবং সেই কারণেই ইরানকে বোঝার জন্য কখনও কখনও রাজনীতির বাইরে তাকাতে হয় সভ্যতার দিকে, ইতিহাসের দিকে, এবং মানুষের আত্মার দিকে।
মন্তব্য করুন