
শীতল যুদ্ধের সময় পর্বতমালার গভীরে নির্মিত একটি পরিত্যক্ত পারমাণবিক বাংকার আজ রূপ নিয়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দুতে। সুইজারল্যান্ডের আল্পসে অবস্থিত এই অতি-নিরাপত্তাসম্পন্ন ভূগর্ভস্থ ভল্টে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ সংরক্ষণ করছে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রতিষ্ঠান টেদার হোল্ডিংস।
ব্লুমবার্গের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, টেদার বর্তমানে প্রতি সপ্তাহে গড়ে এক থেকে দুই টন স্বর্ণ ভল্টে যুক্ত করছে। গত এক বছরে প্রতিষ্ঠানটি মোট ৭০ টনের বেশি স্বর্ণ সংগ্রহ করেছে। সব মিলিয়ে টেদারের স্বর্ণ মজুত প্রায় ১৪০ টনে পৌঁছেছে, যার বাজারমূল্য আনুমানিক ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই পরিমাণ স্বর্ণ অনেক দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভকেও ছাড়িয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টেদারের মতো একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এত বড় আকারে স্বর্ণ বিনিয়োগ বৈশ্বিক স্বর্ণবাজারে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, গত বছর আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম আউন্সপ্রতি রেকর্ড ৫,২০০ মার্কিন ডলার অতিক্রম করার পেছনে এ ধরনের বৃহৎ বিনিয়োগ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
টেদারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পাওলো আরদোইনো এক সাক্ষাৎকারে জানান, প্রতিষ্ঠানের অর্জিত বিপুল মুনাফার একটি বড় অংশ তারা ধারাবাহিকভাবে স্বর্ণে বিনিয়োগ করছেন। তার মতে, “ধীরে ধীরে আমরা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ স্বর্ণ ধারণকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছি।” তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে টেদার কার্যত একটি বেসরকারি ‘স্বর্ণের কেন্দ্রীয় ব্যাংক’-এর মতো ভূমিকা নিতে পারে।
আরদোইনোর ধারণা, বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সরকারি ঋণের প্রতি আস্থাহীনতা বৃদ্ধির ফলে অনেক প্রভাবশালী দেশ মার্কিন ডলারের বিকল্প হিসেবে স্বর্ণভিত্তিক মুদ্রা ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকতে পারে। ডিজিটাল মুদ্রার পাশাপাশি ভৌত সম্পদ হিসেবে স্বর্ণে টেদারের জোরালো বিনিয়োগ সেই সম্ভাব্য পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত বহন করছে।
নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার প্রশ্নে টেদার অত্যন্ত কঠোর নীতি অনুসরণ করছে। প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ব্যাংক এইচএসবিসি থেকে অভিজ্ঞ স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের নিয়োগ দিয়েছে। সুইজারল্যান্ডের সুরক্ষিত এই ভূগর্ভস্থ বাংকারে পুরু স্টিলের দরজার আড়ালে সংরক্ষিত স্বর্ণভাণ্ডারকে আরদোইনো মজা করে ‘জেমস বন্ডের আস্তানা’ বলে উল্লেখ করেছেন।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে টেদারের এই ‘স্বর্ণ দুর্গ’ বৈশ্বিক অর্থনীতির বিদ্যমান কাঠামো ও আর্থিক ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
সূত্র: দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া
মন্তব্য করুন