
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সংবিধান অনুযায়ী যেকোনো সময় পদত্যাগপত্র জমা দিতে পারেন। এ বিষয়ে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়, সরকার বা সংশ্লিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না জানালেও বঙ্গভবনের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, তাঁর পদত্যাগের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র প্রস্তুত রয়েছে এবং আজ শুক্রবার বিকেলে জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে তা জমা দেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে জানা গেছে, স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ পূর্বনির্ধারিত সময়ের দুই দিন আগেই আজ দুপুরে থাইল্যান্ড সফর শেষে দেশে ফিরছেন। যদিও এই দুটি ঘটনার মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক নিশ্চিত করা হয়নি।
রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগ নিয়ে কয়েক দিন ধরে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলার মধ্যেই পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হতে পারেন, তা নিয়েও বিভিন্ন মহলে জল্পনা শুরু হয়েছে। বিএনপির উচ্চপর্যায়ে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে দলীয় সূত্রের দাবি।
দলীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। দল ও সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে তাঁর নাম আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বলে সূত্রগুলোর দাবি। তিনি নির্বাচিত হলে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হবেন।
সূত্রগুলোর ভাষ্য, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে দায়িত্বশীল ও সংযত ভূমিকা, দুঃসময়ে দলের নেতৃত্ব এবং সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য ভাবমূর্তির কারণে মির্জা ফখরুলকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ সম্পর্কে আমার কিছুই জানা নেই। এগুলো সব গুজব।”
মির্জা ফখরুল ছাড়াও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আব্দুল মঈন খান ও নজরুল ইসলাম খানের নামও সম্ভাব্য প্রার্থীদের আলোচনায় রয়েছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। এ ছাড়া অরাজনৈতিক ও প্রাজ্ঞ ব্যক্তি হিসেবে অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহর নামও বিবেচনায় রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদের এক প্রভাবশালী সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, “একটি নামই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রয়েছে। আপাতত বিকল্প নিয়ে ভাবা হচ্ছে না।”
এদিকে সম্প্রতি দেশের বাইরে অবস্থানরত কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গে রাষ্ট্রপতির যোগাযোগ নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন মো. সাহাবুদ্দিন। গতকাল কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, “এসব সংবাদের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। এগুলো গল্পকাহিনি। পৃথিবী এখন এত ছোট হয়ে গেছে যে ফোন করার জন্য লন্ডন যেতে হয় না। এখান থেকেই যে কেউ কথা বলতে পারেন। মানুষ গল্প বানাচ্ছে।”
রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার সাময়িকভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। এরপর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জাতীয় সংসদে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। একাধিক প্রার্থী থাকলে সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, আর একক প্রার্থী হলে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হবেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পরবর্তী রাষ্ট্রপতির মেয়াদকালেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকায় এই নিয়োগ রাজনৈতিকভাবেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
বিষয়টি নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, “আমি রাজনীতি করি, রাজনীতি করব। দল বিপদে পড়লে আবার সামনে দাঁড়াব। এটিই আমার দায়িত্ব। দলে আমি যে অবস্থানেই থাকি না কেন, দেশ বা দল সংকটে পড়লে সামনের কাতারেই থাকব।”
সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিজের নাম আলোচনায় থাকার বিষয়ে অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, “এ বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই। আমি এ বিষয়ে কোনো কর্তৃপক্ষও নই। নতুন রাষ্ট্রপতি কে হবেন, সে বিষয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ই অবগত। বাইরে থেকে মন্তব্য করার কিছু নেই।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, “রাষ্ট্রপতি চাইলে সংবিধান অনুযায়ী পদত্যাগ করতে পারেন। স্বাস্থ্যগত বা অন্য যেকোনো কারণেই সে সুযোগ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য নেই। গুঞ্জন তো গুঞ্জনই। ঘটনা ঘটলে তখন দেখা যাবে। সরকারের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ নেই।”
অন্যদিকে সংসদ সচিবালয়ের সূত্র জানিয়েছে, স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের দেশে ফেরার সময়সূচি পরিবর্তন করা হয়েছে। আগামী রোববার ফেরার কথা থাকলেও তিনি আজই দেশে ফিরছেন।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ ও পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, “সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রের মাধ্যমে পদত্যাগ করতে পারেন। আর ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে, অথবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা কিংবা অন্য কোনো কারণে দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।”
তবে রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগ কিংবা নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিষয়ে এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির কার্যালয়, সরকার বা নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা থাকলেও আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
মন্তব্য করুন