ইরানের বেশ কয়েকটি কৌশলগত এলাকায় গভীর রাতে দফায় দফায় শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। তবে এই হামলার পেছনে নিজেদের কোনো ধরনের ভূমিকা থাকার কথা দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। অন্যদিকে, এই ঘটনার পরপরই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি।” নতুন এই বিস্ফোরণকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ও রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, ইরানের আধা-সরকারি গণমাধ্যমগুলো দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক বিস্ফোরণের খবর নিশ্চিত করেছে। দেশটির মেহর নিউজ এজেন্সির তথ্যমতে, বুশেহর শহর ও এর আশপাশের চোগাদাক এলাকা এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় কোনারাক শহরে বিকট শব্দে বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণ ঘটে। উল্লেখ্য, বুশেহর শহরেই ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি অবস্থিত।
দায় অস্বীকার যুক্তরাষ্ট্রের, আঞ্চলিক উত্তেজনা তুঙ্গে:
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) আল জাজিরাকে দেওয়া এক বিবৃতিতে সরাসরি জানিয়েছে, গত কয়েক ঘণ্টায় ইরানের অভ্যন্তরে তারা কোনো সামরিক অভিযান বা হামলা চালায়নি।
চলতি সপ্তাহের মঙ্গলবার থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শুরু হওয়া পাল্টাপাল্টি হামলার জেরে অঞ্চলটিতে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। এর মধ্যে ইরান কাতার, বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতেও হামলা চালিয়েছে। ফলে গত জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে দুই পক্ষের মধ্যে হওয়া ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি এখন পুরোপুরি ভেস্তে যাওয়ার মুখে পড়েছে।
এদিকে, বুশেহরের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাবিষয়ক উপ-গভর্নর এহসান জাহানিয়ান জানিয়েছেন, শহরে যে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে, তা মূলত ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হওয়ার কারণে হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেছেন যে, শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত একটি সামরিক স্থাপনায় একটি প্রজেক্টাইল (ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন) আঘাত হেনেছে।
ইসরায়েলের কঠোর অবস্থান ও ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া:
বিস্ফোরণের খবর প্রকাশ্যে আসার পরপরই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানান, উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার ফোনে দীর্ঘ আলাপ হয়েছে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে কৌশলগত সমন্বয় বজায় রাখার বিষয়ে দুই নেতাই একমত হয়েছেন।
ইসরায়েলের হাতজেরিম বিমানঘাঁটিতে বিমানবাহিনীর এক গ্র্যাজুয়েশন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে নেতানিয়াহু বলেন: ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। আমাদের সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।”
একই অনুষ্ঠানে ইসরায়েলের সেনাপ্রধান জেনারেল ইয়াল জামির জানান, ইরানের বিরুদ্ধে তাদের সুনির্দিষ্ট অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং সামনে বড় ধরনের নতুন সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজও সুর মিলিয়ে বলেন, “প্রয়োজনে আবারও ইরানের ভেতরে আঘাত হানতে আমরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত।”
সংকটের নেপথ্যে হরমুজ প্রণালি:চলতি সপ্তাহের শুরুতে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’তে বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের আকস্মিক হামলার পর থেকেই এই নতুন সংঘাতের সূত্রপাত হয়। ইরান চায় এই অঞ্চলের সমস্ত বাণিজ্যিক জাহাজ যেন তাদের নির্ধারিত রুট ও নিয়ম মেনে চলাচল করে। তবে উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানি নেতাদের তীব্র ভাষায় সমালোচনা করে তাদের ‘নোংরা লোক’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, দুই দেশের মধ্যে আগের অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা কার্যত শেষ হয়ে গেছে, যদিও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ তা বাতিল ঘোষণা করেনি।
মন্তব্য করুন