ময়মনসিংহ নগরীতে নির্মাণাধীন বহুতল ভবনের পাশে পাঁচতলা একটি ভবন হেলে পড়েছে। হেলে পড়া ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন (মসিক) কর্তৃপক্ষ। নির্মাণাধীন প্রতিষ্ঠানসহ তিনটি ভবন মালিককে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ তলব করা হয়েছে।
রোববার (১৪ ডিসেম্বর) বিকেলে নগরীর গোলকিবাড়ী বাইলেন কাজী অফিসসংলগ্ন এলাকা পরিদর্শন করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সরেজমিনে ময়মনসিংহ নগরের গুলকিবাড়ি বাইলেন এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, ভবনের প্রবেশমুখে কিছু জায়গায় ফাটল দেখা গেছে। ভবনটি হেলে পেছনের ১৩ তলা একটি বহুতল ভবনের দিকে চলে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পাঁচতলা বিশিষ্ট ‘শাকিল ম্যানসন’ নামে বাড়িটির মালিক লন্ডনপ্রবাসী এ এস এম রিয়াজুল আমিন। তবে বাড়ির দেখভাল করেন রিয়াজুলের বড় ভাই রফিকুল ইসলাম। পাঁচ শতক জমিতে ২০১১ সালে বাড়ির নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রথমে চারতলা সম্পন্ন হলেও সম্প্রতি পঞ্চম তলার কাজ শুরু হয়, যা সম্পূর্ণ শেষ হয়নি। বাসার ১০টি ইউনিটের মধ্যে আটটি ইউনিটে ভাড়াটেরা বসবাস করতেন। পাশে ‘কাজীবাড়ি’ নামে ১৩ তলা ভবনের নির্মাণকাজ চলছিল। প্রায় ছয় মাস ধরে পাইলিং শেষে খননযন্ত্র দিয়ে গভীর গর্ত করে মাটি সরানো হচ্ছিল।
শনিবার ভবনের সামনে ও পাশের অংশে ফাটল দেখা দিলে আতঙ্ক শুরু হয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে যান।
আরও পড়ুন:
স্থানীয় বাসিন্দারা পরিদর্শন টিমের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এসব ঘটনায় আমরা নগরবাসী আতঙ্কিত, যেকোনো সময় ঘটতে পারে বড় কোনো দুর্ঘটনা। কারণ নগরীর বেশিরভাগ বিল্ডিং নির্মাণে মানা হয়নি বিল্ডিং কোড। সরু রাস্তায় দেয়া হয়েছে বহুতল ভবনের অনুমোদন, এসব নিয়ে নগর কর্তৃপক্ষের অবহেলা দৃশ্যমান।’
তিনি আরও বলেন, ‘কোনো ঘটনা ঘটলেই বলা হয় এটি পৌরসভার সময়ে অনুমোদন নেয়া। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে মোটা অংকের আর্থিক লেনদেনে ব্যাক-ডেইটে নগরীর বেশিরভাগ ভবনের অনুমোদন দেয়া হয়েছে বলেও প্রচার রয়েছে।’
আনন্দ মোহন কলেজের সহযোগী অধ্যাপক শাহ মো. জুয়েল বলেন, ‘হঠাৎ শনিবার সন্ধ্যায় ফাটল দেখা দেয়ায় জরুরি কাগজপত্র নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে যাই। রাতভর উৎকণ্ঠার মধ্যে ছিলাম। বাসা থেকে মালামাল নিয়ে শ্বশুরবাড়ি রেখেছি, পরে নতুন বাসায় উঠব। হঠাৎ এই ভোগান্তি হলেও বড় দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে গেছি, এটা স্বস্তির।’
হেলে পড়া ভবনের দেখভালকারী রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘শনিবার মাগরিবের নামাজের পর ফাটল বেশি লক্ষ্য করি। দুই দিন ধরে হালকা ফাটল দেখা যাচ্ছিল। খননযন্ত্র দিয়ে মাটি কাটায় এমন হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বেশি ফাটল দেখে ডেভেলপার কোম্পানির লোকজন, ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশকে জানাই। আমি বিল্ডিং কোড অনুযায়ী তিন ফুট জায়গা ছেড়ে ভবন করেছি, কিন্তু নির্মাণাধীন ভবনটি কোনো জায়গা ছাড় ছিল না। আমার সীমানা প্রাচীরও পাইলিং করার সময় ভেঙে ফেলেছে। সরকারের কাছে আবেদন, বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নিন। এত সরু এলাকায় কীভাবে বহুতল ভবনের অনুমোদন দেয়া হলো, তা ভাবতে হয়। আমার ভবনের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।’
সিটি করপোরেশনের নকশা অনুমোদন কমিটির সদস্য ও ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সটিটিউশন অব বাংলাদেশের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিভিশনের সাধারণ সম্পাদক নেসার উদ্দিন বলেন, ‘আমরা পরিদর্শন করে দেখেছি ভবন নির্মাণে যথাযথ নিয়ম মানা হয়নি। ফলে বেইজমেন্টের জন্য মাটি কাটলে পাশের ভবনটি হেলে পড়েছে। আমাদের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে হেলেপড়া ভবনটি সম্পূর্ণ বসবাস অনুপযোগী, দাফতরিকভাবেও এটি ঘোষণা করা হবে।’
তিনি বলেন, ‘এই ভবনটিতে যেকোনো সময় বড় ধরণের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। ভবন নির্মাণের জন্য যে গর্ত করা হয়েছিল সেটি পুরোপুরি মাটি ভরাট করে ফেলতে হবে, তা না হলে রাস্তা ও আশপাশের ভবনও ঝুঁকিতে পড়বে। কর্তৃপক্ষকে কাগজপত্র নিয়ে ডাকা হবে। তারা নকশা মেনে কাজ করছে কী না তা দেখা হবে এবং কী ত্রুটি ছিলো তাও দেখা হবে। তারপর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার জুলহাস উদ্দিন বলেন,‘পাইলিং শেষে বহুতল ভবন নির্মাণের জন্য খননযন্ত্র দিয়ে গভীর গর্ত থেকে মাটি সরানো হচ্ছিল। এতে পাশের পাঁচতলা ভবনটির বিভিন্ন জায়গায় ফাটল ধরেছে। যেকোনো সময় বড় ধরনের সমস্যা হতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘ভবনটিতে অনেক বাসিন্দা থাকায় তাদের নিরাপদে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। বাসার ভেতরে থাকা ভারী মালামাল সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বিল্ডিং কোড মেনে যদি ভবন করা হতো, তাহলে এমন পরিস্থিতি হতো না।’
সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুমনা আল মজীদ বলেন, ‘হেলে পড়া ভবনসহ নির্মাণাধীন ভবনটিও বিল্ডিং কোড না মেনে পাইলিং করার কারণে এই হেলে পড়ার ঘটনা ঘটেছে। এ কারণে নির্মাণাধীন ভবনের পাইলিংয়ের কাজ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।’
সুমনা আল মজীদ আরও বলেন, ‘এই অবস্থায় দেয়ালে ফাটল দেখা দেয়ায় এবং হেলা পড়া ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে নির্মাণাধীন গ্রিন ডেভেলপমেন্ট প্রতিষ্ঠানসহ তিন ভবন মালিককে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ তলব করা হয়েছে। তাদের কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘নির্মাণাধীন গ্রিন ডেভেলপমেন্ট প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ২০১৭ সালে তৎকালীন পৌরসভা থেকে ১৩তলা ভবনের অনুমোদন নেয়া হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী অনুমোদন নেয়ার তিন বছরের মধ্যে ভবনের নির্মাণ কাজ করার কথা। কিন্তু এখন যে ভবনটি নির্মাণ করা হচ্ছে এটির অনুমোদনের মেয়াদ প্রায় ৫ বছর আগে শেষ হয়ে গেছে। এ কারণে তাদের কাজপত্রসহ তলব করা হয়েছে।’
মন্তব্য করুন