সিপিএন ডেস্ক:
২৪ নভেম্বর ২০২৫, ১:৫২ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ
পাঠক সংখ্যা ১২৪ জন

হাসিনার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে বাংলাদেশের বড় বাধা ভারত

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা একসময় ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির পরিচিত মুখ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ কন্যা হিসেবে তার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৭০-এর দশকে। কিন্ত ১৯৭৫ এ আগস্টে তার জীবন পাল্টে যায়, বাবার হত্যাকাণ্ড আর সেই ট্র্যাজেডির প্রভাব তার রাজনৈতিক পরিচয় ও নেতৃত্বে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়। এই যাত্রা তাকে ক্ষমতার শীর্ষে নিয়ে যায়, কিন্তু বর্তমান সময়ে তিনি ভারতে নির্বাসিত, এবং তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সম্প্রতি মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা হয়েছে। নয়াদিল্লি তাকে প্রত্যর্পণ করলে যে কোনো সময় এই রায় কার্যকর হতে পারে।

 

২০২৪ সালের ছাত্র ও জনগণের গণঅভ্যুত্থানকে দমন করার অভিযোগে শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। এই গণঅভ্যুত্থানের প্রভাবেই তার সরকার পতনের মুখে পড়ে। ১৫ বছরের একচ্ছত্র শাসনের পর ধীরে ধীরে কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠা এই নেত্রী গত বছরের ৫ আগস্ট ভারতে পালিয়ে যান এবং সেখানে তার ঘনিষ্ঠ মিত্রদের কাছে রাজধানীতে আশ্রয় নেন। বর্তমানে তিনি দুই দেশের মধ্যবর্তী জটিল অচলাবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশ তার প্রত্যর্পণ দাবি করছে, কিন্তু ক্ষমতাচ্যুত ফ্যাসিস্ট হাসিনা দাবি করছেন যে অভিযোগগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

আরও পড়ুন:

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মোবাশ্বার হাসান বলেন, ‘গণরোষ থেকে বাঁচতেই তাকে দেশ ছাড়তে হয়েছিল। তিনি ভারতে লুকিয়ে আছেন, আর তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হলো—এ এক ব্যতিক্রমী গল্প।’ শেখ হাসিনার নিজস্ব ভাষায়, ‘তাকে পালাতে হয়েছিল—এটা নিজের অপরাধেরই একটি স্বীকারোক্তি। জনগণ, বিভিন্ন বাহিনী—সবাই তার বিরুদ্ধে চলে গিয়েছিল। কারণ, তিনি সীমা অতিক্রম করেছিলেন। তিনি হত্যা করেছেন, তার নির্দেশে অনেক মানুষ প্রাণ হারিয়েছে।’ এই স্বীকারোক্তি ও বিতর্ক তার রাজনৈতিক জীবনের জটিলতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

শেখ হাসিনার রাজনৈতিক যাত্রা বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত। ১৯৭৫ সালের আগস্টে তার পরিবারের বাবা, মা ও তিন ভাই নিহত হন। সে সময় তিনি ও তার বোন পশ্চিম জার্মানিতে থাকায় বেঁচে যান। ওই সময় ক্ষমতায় আসে জেনারেল জিয়াউর রহমান, যিনি পরবর্তীতে খালেদা জিয়ার স্বামী ও শেখ হাসিনার প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হন।

 

পরিবারের সদস্যদের হারানোর পর ছয় বছরের নির্বাসনে ভারতের প্রতি তার কৃতজ্ঞতার অনুভূতি গড়ে দেয়। ছয় বছর ভারতেই কাটান এবং এটিই ভবিষ্যৎ জীবনে ভারতের প্রতি তার আস্থাকে দৃঢ় করে। ১৯৮১ সালে দেশে ফেরার পর তিনি দেখেন ‘জনগণ নতুন আশা নিয়ে তার দিকে’ তাকিয়ে আছে। অন্যদিকে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন আরেক ট্র্যাজিক চরিত্র— খালেদা জিয়া। দেশে ফিরেই হাসিনা বলেন, “বিমানবন্দরে নেমে আপনজন কাউকে পাইনি, কিন্তু পেয়েছি লাখো মানুষের ভালোবাসা— এটা ছিল আমার শক্তি”।

১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর শেখ হাসিনা ১৯৭৫ সালের হত্যাকাণ্ডের বিচার শুরু করেন। এক মেয়াদ শেষে ক্ষমতা হারানোর পর ২০০৮ সালে আবার সরকার গঠন করেন। তখন তিনি আরও কঠোর, সতর্ক এবং নিজের অবস্থান অটুট রাখার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন। তার শাসনামলে অর্থনৈতিক অগ্রগতি ঘটে, ভারত–বাংলাদেশ সহযোগিতা গভীর হয়। তবে মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিরোধীদের ওপর দমন–পীড়ন, নির্বাচন নিয়ে অনিয়ম এবং একদলীয় শাসনের দিকে অগ্রসর হওয়ার কারণে সমালোচনা বেড়ে যায়।

শিক্ষার্থী আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া গণআন্দোলনের সহিংস দমন প্রসঙ্গে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের মতে অন্তত ১৪০০ মানুষ নিহত হয়। কিন্তু আন্দোলন থেমে যায়নি; বরং তা আরও প্রবল হয়ে ওঠে। অবশেষে সরকারের পতন ঘটে। মোবাশ্বার হাসান বলেন, ‘জনগণ এবং বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনী পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে চলে গিয়েছিল।’ এই ঘটনা দেশের রাজনৈতিক অচলাবস্থা আরও জটিল করেছে।

 

বর্তমানে ভারতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ভারতে রাজনৈতিক শরণার্থী হিসেবে হাসিনার জীবন প্রায় অর্ধশতাব্দী আগের নির্বাসনের মতো। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার অনুপস্থিতিতে বিচার হয় এবং মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। অভিযোগ—বিক্ষোভকারীদের হত্যায় উসকানি, ফাঁসির নির্দেশ, এবং দমন–পীড়নে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের অনুমোদন। ভারত এই রায় পর্যবেক্ষণ করছে এবং বাংলাদেশসহ সকল পক্ষের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে যুক্ত থাকার আশ্বাস দিয়েছে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন রয়ে যায়—শেখ হাসিনার বিদায়ে কি বাংলাদেশের দীর্ঘ, বিভাজনময় যুগ সমাপ্ত হবে, নাকি দেশ আরও অনিশ্চিত রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করবে? এই রায় বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনের আগে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, রাজনৈতিক বিভেদ সহজে কাটবে না। মোবাশ্বার হাসান উল্লেখ করেন, ‘বাংলাদেশ এখনো মিলেমিশে চলার মতো অবস্থায় নেই। আওয়ামী লীগ হয়তো ফিরে আসার পথ খুঁজবে—তবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নয়।’

 

সূত্র-ইত্তেফাক অনলাইন

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’ চালু করছে সরকার, যে সুবিধা পাবেন চাকরি প্রত্যাশীরা

১

মেসির পর আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সি যার গায়ে উঠবে

২

মালয়েশিয়ায় ন্যূনতম মজুরি বাড়িয়ে ২ হাজার রিঙ্গিত, লাভবান হবেন বাংলাদেশিরাও

৩

দেশের বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও ভোক্তার স্বার্থ রক্ষায় ভারতে ইলিশ রপ্তানি বন্ধে লিগ্যাল নোটিশ

৪

পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদ লালনের পরিণতি ভোগ করতে হবে

৫

পুলিশে যুক্ত হচ্ছে নতুন ইউনিট, শাখা থাকবে মেট্রো, ডিভিশন ও জেলায়

৬

থানার দরজা ভেঙে বেরিয়ে গেল ২২ কিশোর

৭

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে আজ বাংলায় ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী

৮

সরকারি হাসপাতালের ১ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো বেসরকারি ক্লিনিক নয়

৯

পবিত্র ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম আজ

১০

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বাস ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব

১১

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী

১২

মামার প্ররোচনায় বিয়ে, নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে মরিয়মের আত্মহত্যা

১৩

জ্বালানি তেলের বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহারের দাবি যাত্রী কল্যাণ সমিতির

১৪

২০২৭ সালের হজ নিবন্ধনে প্যাকেজ মূল্য কত টাকা, আর বাকি ৪ দিন

১৫

জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে ভাষণ দেবেন তারেক রহমান

১৬

দাবি যে কোনো সময় এক দফায় পরিণত হতে পারে: জামায়াত আমির

১৭

সার্ককে সক্রিয় করতে ভুটানের সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ

১৮

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনিয়র মাদ্রাসায় পরিণত হয়েছে: ফজলুর রহমান

১৯

সাংবাদিকরা আছেন বলেই দেশে গণতন্ত্র টিকে আছে : তথ্যমন্ত্রী

২০