সিপিএন ডেস্ক
৯ মার্চ ২০২৬, ১২:৩০ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ
পাঠক সংখ্যা ৩০৭ জন

পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে হতে পারে যেসব মারাত্মক রোগ

ছবিঃ সংগৃহীত

নিশ্চিন্ত ঘুম মানুষের সুস্থ জীবনের অন্যতম ভিত্তি। অথচ আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, কাজের চাপ, প্রযুক্তিনির্ভরতা আর মানসিক উদ্বেগের কারণে ঘুম আজ অনেকের কাছেই বিলাসে পরিণত হয়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় কম ঘুমানো বা অনিয়মিত ঘুমের অভ্যাসকে বলা হয় ঘুমের ঘাটতি। এটি শুধু সাময়িক ক্লান্তি নয়, দীর্ঘমেয়াদে শরীর ও মনের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। অনেক সময় মানুষ বুঝতেই পারে না, দৈনন্দিন নানা শারীরিক ও মানসিক সমস্যার পেছনে মূল কারণ হতে পারে পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব।

ঘুমের ঘাটতির প্রথম ও সবচেয়ে সাধারণ প্রভাব পড়ে মস্তিষ্কে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে যায়, স্মৃতিশক্তি দুর্বল হতে শুরু করে। কাজ শেখা, সিদ্ধান্ত নেওয়া বা সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা কমে যায়। শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে পেশাজীবী- সবাই এর নেতিবাচক প্রভাব অনুভব করেন। দীর্ঘদিন ঘুমের ঘাটতি চলতে থাকলে বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও খিটখিটে মেজাজ দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে হতাশা ও মানসিক অস্থিরতা বাড়তে থাকে, যা সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলে।

ঘুম শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ঘুমের সময় শরীর বিভিন্ন প্রতিরোধক কোষ ও প্রোটিন তৈরি করে, যা সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করে। নিয়মিত কম ঘুমালে এই প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। ফলে সর্দি-কাশি, জ্বরসহ বিভিন্ন সংক্রমণে সহজেই আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। দীর্ঘমেয়াদে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্‌রোগের মতো জটিল অসুখের সম্ভাবনাও বেড়ে যায়।

হৃদ্‌যন্ত্রের ওপর ঘুমের ঘাটতির প্রভাব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরে স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়, যা রক্তচাপ ও হৃদ্‌স্পন্দন বাড়ায়। এতে হৃদ্‌যন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দীর্ঘদিন কম ঘুমান, তাদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। বিশেষ করে মধ্যবয়সী ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুতর।

ঘুমের অভাব বিপাকক্রিয়াকেও ব্যাহত করে। শরীরের ইনসুলিন ব্যবস্থাপনায় সমস্যা দেখা দেয়, যার ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ে। পাশাপাশি ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়। ফলে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়, বিশেষ করে উচ্চ ক্যালোরিযুক্ত খাবারের প্রতি আকর্ষণ বাড়ে। এর পরিণতিতে ওজন বৃদ্ধি ও স্থূলতার সমস্যা দেখা দেয়।

ত্বক ও সৌন্দর্যের ওপরও ঘুমের ঘাটতির প্রভাব পড়ে। ঘুমের সময় ত্বক নিজেকে মেরামত করে এবং নতুন কোষ তৈরি হয়। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে ত্বক হয়ে পড়ে শুষ্ক ও নিষ্প্রভ, চোখের নিচে কালো দাগ ও ফোলাভাব দেখা দেয়। দীর্ঘদিন কম ঘুমালে বয়সের ছাপ দ্রুত পড়ে, বলিরেখা বাড়ে। চুল পড়া ও চুলের স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা কমে যাওয়ার সঙ্গেও ঘুমের অভাব জড়িত।

শারীরিক শক্তি ও কর্মক্ষমতার দিক থেকেও ঘুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীর সারাদিন ক্লান্ত অনুভব করে, পেশিতে ব্যথা ও দুর্বলতা দেখা দেয়। খেলোয়াড় বা শারীরিক পরিশ্রমের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের ক্ষেত্রে এটি পারফরম্যান্সে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। এমনকি দৈনন্দিন কাজেও ভুলের সংখ্যা বাড়তে থাকে। গাড়ি চালানো বা যন্ত্রপাতি ব্যবহারের সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

হরমোনের ভারসাম্য রক্ষায় ঘুমের ভূমিকা অপরিসীম। ঘুমের ঘাটতি হলে থাইরয়েড, কর্টিসলসহ বিভিন্ন হরমোনের স্বাভাবিক নিঃসরণ ব্যাহত হয়। এর ফলে নারীদের ক্ষেত্রে মাসিক চক্রে অনিয়ম দেখা দিতে পারে, পুরুষদের ক্ষেত্রে যৌনস্বাস্থ্য ও শক্তি কমে যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে প্রজননস্বাস্থ্যও ঝুঁকির মুখে পড়ে।

শিশু ও কিশোরদের জন্য ঘুমের গুরুত্ব আরও বেশি। এই বয়সে শরীর ও মস্তিষ্ক দ্রুত বিকশিত হয়। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে তাদের শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে, পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যায় এবং আচরণগত সমস্যা দেখা দেয়। অতিরিক্ত মোবাইল ফোন বা কম্পিউটার ব্যবহারের কারণে অনেক শিশু-কিশোর রাত জেগে থাকে, যা ভবিষ্যতে তাদের স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

ঘুমের ঘাটতি শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকেও প্রভাব ফেলে। কর্মক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা কমে, অসুস্থতার কারণে কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। দুর্ঘটনা ও ভুল সিদ্ধান্তের ফলে আর্থিক ক্ষতির সম্ভাবনাও বাড়ে। একটি সুস্থ ও কার্যকর সমাজ গড়ে তুলতে নাগরিকদের পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ঘুম নিশ্চিত করা জরুরি।

সব দিক বিবেচনায় বলা যায়, ঘুম কোনো বিলাসিতা নয়, এটি জীবনের অপরিহার্য চাহিদা। সুস্থ থাকতে চাইলে নিয়মিত নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো, ঘুমের আগে মোবাইল ব্যবহার কমানো, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং আরামদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শরীর ও মনের যত্নে খাবার ও ব্যায়ামের মতোই ঘুমকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ পর্যাপ্ত ঘুমই পারে মানুষকে সুস্থ, সতেজ ও কর্মক্ষম রাখতে।

Facebook Comments Box

No tags found for this post.

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’ চালু করছে সরকার, যে সুবিধা পাবেন চাকরি প্রত্যাশীরা

১

মেসির পর আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সি যার গায়ে উঠবে

২

মালয়েশিয়ায় ন্যূনতম মজুরি বাড়িয়ে ২ হাজার রিঙ্গিত, লাভবান হবেন বাংলাদেশিরাও

৩

দেশের বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও ভোক্তার স্বার্থ রক্ষায় ভারতে ইলিশ রপ্তানি বন্ধে লিগ্যাল নোটিশ

৪

পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদ লালনের পরিণতি ভোগ করতে হবে

৫

পুলিশে যুক্ত হচ্ছে নতুন ইউনিট, শাখা থাকবে মেট্রো, ডিভিশন ও জেলায়

৬

থানার দরজা ভেঙে বেরিয়ে গেল ২২ কিশোর

৭

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে আজ বাংলায় ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী

৮

সরকারি হাসপাতালের ১ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো বেসরকারি ক্লিনিক নয়

৯

পবিত্র ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম আজ

১০

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বাস ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব

১১

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী

১২

মামার প্ররোচনায় বিয়ে, নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে মরিয়মের আত্মহত্যা

১৩

জ্বালানি তেলের বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহারের দাবি যাত্রী কল্যাণ সমিতির

১৪

২০২৭ সালের হজ নিবন্ধনে প্যাকেজ মূল্য কত টাকা, আর বাকি ৪ দিন

১৫

জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে ভাষণ দেবেন তারেক রহমান

১৬

দাবি যে কোনো সময় এক দফায় পরিণত হতে পারে: জামায়াত আমির

১৭

সার্ককে সক্রিয় করতে ভুটানের সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ

১৮

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনিয়র মাদ্রাসায় পরিণত হয়েছে: ফজলুর রহমান

১৯

সাংবাদিকরা আছেন বলেই দেশে গণতন্ত্র টিকে আছে : তথ্যমন্ত্রী

২০