ডেস্ক রিপোর্ট
২৫ অগাস্ট ২০২৫, ৯:০৩ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ
পাঠক সংখ্যা ১৪৭ জন

বিলুপ্তির পথে বাবুই পাখির বাসা

পরম যত্নে আর মমতায় নিপুন শৈল্পিক যাদুর আবাসন ব্যবস্থা। এ যেন পাথুরে কংক্রীটের শহুরে সভ্যতার মাঝে বিশ্বের অষ্টম আশ্চার্য। যাকে নিয়েই আজকের আয়োজন।

নিপুণ বাসা তৈরির দক্ষ করিগর বাবুই পাখি। এ বাসা এখন আর আগের মতো চোখে পড়ে না। পরিবেশ বিপর্যয়, জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড়, নতুন বণায়নে বাসযোগ্য পরিবেশ ও খাদ্যের অভাব, নির্বিচারে তালগাছ কর্তন, অসাধু শিকারীর ফাঁদসহ বহুবিধ কারণে প্রকৃতির স্থপতি, এবং সামাজিক বন্ধনের প্রতিচ্ছবি বাবুই পাখির দৃষ্টিনন্দন বাসা ক্রমান্বয়ে হারিয়ে যাচ্ছে গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে।

আজ থেকে ১৫-২০ বছর আগেও গ্রামগঞ্জে ব্যাপকভাবে বাবুই পাখির বাসা চোখে পড়ত। কিচিরমিচির শব্দ আর এদের শৈল্পিক বাসা মানুষকে পুলকিত করত। অপূর্ব শিল্প শৈলীতে প্রকৃতির অপার বিস্ময় এদের সেই ঝুলন্ত বাসা বাড়ির তালগাছসহ নদীর পাড়ে, পুকুর পাড়ে, বিলের ধারে এখন আর সচরাচর চোখে পড়ে না। বাবুই পাখির কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত হয় না গ্রাম বাংলার জনপদ।

নিরীহ, শান্ত প্রকৃতির এই বাবুই পাখি উচু এবং নিরিবিলি পরিবেশে বাসা তৈরি করে। গ্রামীন পরিবেশে তাল, সুপারি, নাড়িকেল, খেজুর গাছে বাসা তৈরি করতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করে এরা। এসব গাছের সংকটে মাঝে মাঝে হিজল গাছেও বাসা বাধতে দেখা যায় তাদের।

এই পাখি বাসা তৈরির কাজে ব্যবহার করে খড়ের ফালি, ধানের পাতা, তালের কচি পাতা, ঝাউ ও কাঁশবনের লতা। এই বাসা বিশেষ করে তাল গাছের ডালে এমনভাবে আটকানো থাকে যাতে কোনো ঝড়-তুফানে সহসাই ছিড়ে না পড়ে। এদের বাসা শুধু শৈল্পিক নিদর্শনই নয়, মানুষের মনে চিন্তার খোরাক জোগায় সেই সাথে স্বাবলম্বী হতে উৎসাহিত করে। এটি দেখতে যেমন আকর্ষণীয় তেমই মজবুত ও টেকসইও বটে । বাসা বানাতে শুরুতেই দুটি নিম্নমুখী গর্ত করে থাকে। পরে তা একদিকে বন্ধ করে ডিম পাড়ার জায়গা করে।

অন্যদিকে লম্বা করে প্রবেশ ও প্রস্থান পথ তৈরি করে। ব্যালেন্স করার জন্য বাসার ভিতরে কাদার প্রলেপ দেয়। এমন বাসাও তৈরি করে যেখানে বসে দোলনার মতো দোল খায়। আধুনিক যুগে যা বড়ই যুক্তি সংগত। বাসার ভিতরে ঠিক মাঝখানে একটি আড়া তৈরি করে বাবুই পাখি। যে আড়াতে পাশাপাশি বসে এরা প্রেম আলাপসহ নানা রকম গল্প করে। এ আড়াতেই এরা নিদ্রা যায়। কি অপূর্ব বিজ্ঞান সম্মত চেতনাবোধ। ছোট হলেও বুদ্ধিতে সব পাখিকে হার মানায়।

এক গাছ থেকে আরেক গাছ, এক বাসা থেকে আরেক বাসায় এরা সঙ্গী খুঁজতো। পছন্দ হলে সঙ্গী বানানোর জন্য কত কিছুই না করে। পুরুষ বাবুই নিজের প্রতি আকর্ষণ করার জন্য ডোবার গোসল সেরে ফুর্তিতে নেচে নেচে উড়ে বেড়ায় এক ডাল থেকে অন্য ডালে। এরপর উচুঁ গাছের ডালে বাসা তৈরির কাজ শুরু করে। অর্ধেক কাজ হলে কাঙ্খিত স্ত্রী বাবুইকে ডেকে সেই বাসা দেখায়। বাসা পছন্দ হলেই কেবল পুরো কাজ শেষ করে। তা না হলে অর্ধেক কাজ করেই নতুন করে আরেকটি বাসা তৈরির কাজ শুরু করে। অর্ধেক বাসা বাঁধতে সময় লাগে ৪-৫ দিন।

কাঙ্খিত স্ত্রী বাবুই পাখির পছন্দ হলে বাকিটা শেষ করতে সময় লাগে আরো ৪ দিন। পুরুষ বাবুই এক মৌসুমে ৬ টি পর্যন্ত বাসা বুনতে পারে। তাছাড়া এরা ঘর করতে পারে ৬ টির সঙ্গে। স্ত্রী বাবুইদের এতে কোনো বাঁধা নেই। প্রজনন প্রক্রিয়ায় স্ত্রী বাবুই ডিমে তা দেয়ার দুসপ্তাহের মধ্যে বাচ্চা ফোটে। আর বাচ্চা বাসা ছেড়ে প্রথম উড়ে যায় জন্মের তিন সপ্তাহের মধ্যে।

কৃষকের ধান ঘরে ওঠার মৌসুম হলো বাবুই পাখির প্রজনন মৌসুম। দুধ ধান সংগ্রহ করে এনে স্ত্রী বাবুই বাচ্চাদের খাওয়ায়। তবে এখন সঙ্গত কারণেই বাবুই পাখি তালগাছ ছেড়ে ভিন্ন গাছে নীড় বেঁধেছে। এই দক্ষ স্থপতি বাবুই পাখির নীড় ভেঙে দিচ্ছে এক শ্রেণীর অসাধু মানুষ। এক সময় গাজীপুরের বিভিন্ন উপজেলার গ্রামে গ্রামে দেখা যেতো অগণিত বাবুই পাখির বাসা। এই এলাকার গাঁও গ্রাম ঘুরেও এখন আর দৃষ্টি নন্দন বাবুই পাখির ঝুলন্ত বাসা আগের মতো দেখা যায় না।

উপজেলার আধবই গ্রামের পাখি প্রেমিক নওশীন বাবু ঐশী বলেন, সারাবিশ্বে বাবুই পাখির প্রজাতির সংখ্যা ১১৭টি। তবে বাংলাদেশে তিন প্রজাতির বাবুই পাখির বাস। তিনি আরও বলেন, বাবুই পাখির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো রাতের বেলায় ঘর আলোকিত করার জন্য এরা জোনাকি পোকা ধরে নিয়ে বাসায় রাখে এবং সকাল হলে আবার তাদের ছেড়ে দেয়। ধান, চাল, গম ও পোকা-মাকড় প্রভৃতি তাদের প্রধান খাবার।

উপজেলা কৃষক ইব্রাহিম বলেন, নিপুণ কারিগর বাবুই পাখি ও তার বাসা টিকিয়ে রাখতে হলে বৃক্ষ নিধনকারীদের হাত থেকে উক্ত গাছ রক্ষা করতে হবে। প্রকৃতিক সোন্দর্য বৃদ্ধিতে বাবুই পাখির বাসা তৈরির পরিবেশ সহজ করে দিতে হবে।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আদ–দ্বীন হাসপাতালে ৬ শিশুর মৃত্যুতে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন: স্বাস্থ্যের ডিজি

আল-আকসা মসজিদে হাজারো মুসল্লির ঈদের নামাজ আদায়

চিপসের লোভ দেখিয়ে শিশুকে পাটখেতে নিয়ে ধর্ষণচেষ্টা

ইসরায়েলকে উপড়ে ফেলার অঙ্গীকার করলেন মোজতবা খামেনি

অবশেষে গরুটি বিক্রি হলো ৫৯ কোটি টাকায়!

ট্রাফিক জংশনে এআই ক্যামেরার জরিমানার নামে প্রতারণার ফাঁদ

সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে ৩ বাংলাদেশি নিহত

রামিসা হত্যা মামলার ফরেনসিক রিপোর্টে বেরিয়ে এলো সত্যতা

বাংলাদেশের ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে খোঁচা দিল ইরান

কৃষকের কষ্টের ফসলে সিন্ডিকেটের থাবা, উঠছে না আবাদের খরচ

১০

শিশু রামিসা হত্যার নৃশংসতার লোমহর্ষক কাহিনী

১১

রামিসা হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দ্রুতই হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১২

অবৈধ বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু: শুভেন্দু

১৩

ভেতরে খুন করা হচ্ছিল রামিসাকে, দরজায় কড়া নাড়ছিলেন মা

১৪

পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করে ঐতিহাসিক কীর্তি গড়ল বাংলাদেশ

১৫

দুর্নীতি ও হয়রানিমুক্ত ডিজিটাল প্রযুক্তিতে হবে ভূমিসেবা: প্রধানমন্ত্রী

১৬

২৮ মে বৃহস্পতিবার পবিত্র ঈদুল আজহা

১৭

ভারতের রাজনৈতিক দলগুলোর চেয়ে বাংলাদেশের জামাতিরা বেশি অস্বস্তিতে পড়েছেঃ শুভেন্দু

১৮

কুমারী মেয়ের নীরবতাই বিয়েতে সম্মতি, আফগান সরকারের নতুন আইন

১৯

রোহিঙ্গা সংকট বেড়েই চলেছে , ১৬ মাসে ঢুকেছে আরও দেড় লাখ

২০