মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এবং বর্তমানে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা তাঁর এই বক্তব্যকে ‘রাজনৈতিক স্টান্টবাজি’ এবং বিরোধী দলের সাবেক ‘ঈদের পরে আন্দোলনের’ চেনা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির সঙ্গে তুলনা করছেন।
সম্প্রতি বার্তা সংস্থা রয়টার্স এবং ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া পৃথক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা এই পরিকল্পনার কথা জানান। এর আগে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশ ছাড়ার পর থেকেই বিভিন্ন অডিও রেকর্ডের মাধ্যমে তিনি বারবার দেশে ফেরার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাঁর পক্ষে দেশে ফেরার মতো বড় ঝুঁকি নেওয়া প্রায় অসম্ভব।
কেন দেশে ফিরবেন না শেখ হাসিনা? বিশ্লেষকদের তিনটি পর্যবেক্ষণ:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন বেপারী মনে করেন, শেখ হাসিনার এই ঘোষণা মূলত দলের তৃণমূল নেতা-কর্মীদের চাঙ্গা রাখার একটি কৌশল মাত্র। তাঁর দেশে না ফেরার পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ কাজ করছে:
আইনি ও ব্যক্তিগত ঝুঁকি: শেখ হাসিনা বর্তমানে আদালতের দৃষ্টিতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত একজন পলাতক আসামি। দেশে ফিরলে তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে আইনের মুখোমুখি হতে হবে এবং বন্দিজীবন বেছে নিতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই ধরনের ঝুঁকি নেওয়ার সাহস বা অনুকূল পরিবেশ তাঁর নেই।
বিপরীতমুখী ভূ-রাজনীতি:আন্তর্জাতিক লবি বা বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সমর্থন এখন আর আওয়ামী লীগের পক্ষে নেই। তা ছাড়া বর্তমান সরকার চীনের সঙ্গে তিস্তা প্রকল্পসহ বিভিন্ন বিষয়ে সম্পর্ক জোরদার করায়, ভারতও দীর্ঘ মেয়াদে শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে নিজেদের কৌশলগত ক্ষতি করতে চাইবে না। খুব দ্রুতই তিনি ভারতের জন্য একটি ‘রাজনৈতিক বোঝা’য় পরিণত হতে পারেন।
ভোগবাদী নেতৃত্বে রূপান্তর: টানা ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকার সুবাদে আওয়ামী লীগের মধ্যম ও শীর্ষ সারির সিংহভাগ নেতা-কর্মী বিপুল অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছেন। তাঁদের একটি বড় অংশ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিলাসী জীবনযাপন করছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভোগবাদে অভ্যস্ত হয়ে পড়া এই বিশাল অংশের নেতা-কর্মী ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে আন্দোলনে নামবেন না।
রাজনৈতিক সমীকরণ:শেখ হাসিনা দেশে পা রাখলে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের সব শক্তি তাৎক্ষণিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হবে। তদুপরি, আওয়ামী লীগ বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের নির্দেশে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন হওয়ায় আইনগতভাবেই তাদের প্রকাশ্যে সংগঠিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের চূড়ান্ত মূল্যায়ন হলো, যতক্ষণ না পর্যন্ত দেশে বড় কোনো রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটছে, ততক্ষণ পর্যন্ত শেখ হাসিনার এই দেশে ফেরার বার্তা কেবলই এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির চেষ্টা। মাঠপর্যায়ে এর মাধ্যমে দলীয় নেতা-কর্মীদের বড় আকারে উজ্জীবিত করার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
মন্তব্য করুন