
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি নিয়ে যে বয়ান বিশ্বমাধ্যমে প্রচারিত হয়, তা অনেকাংশেই একপেশে সরলীকৃত ইমেজ। সেখানে রাষ্ট্রগুলোকে দেখা হয় কেবল ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, যুদ্ধ বা নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপটে। কিন্তু কিছু দেশ, কিছু জাতি আছে যাদের কেবল রাজনীতির ভাষায় বা বাহ্যিক বিচারে বোঝা সম্ভব না। যেমন ইরান, তথা পারস্য সাম্রাজ্য। তাদের ভেতরে লুকিয়ে আছে বহু শতাব্দীর সভ্যতা, আধ্যাত্মিকতা, কাব্যময়তা ও সাংস্কৃতিক স্মৃতি। ইরানকে ঘিরে সমসাময়িক বিতর্ক—বিশেষত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তার শাসনামল নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনাও—এই জটিল বাস্তবতারই প্রতিফলন। কারও কাছে তিনি কঠোর শাসনের প্রতীক, কারও কাছে প্রতিরোধের প্রতীক। কিন্তু এই দ্বৈততার ভেতরে রয়েছে আরও গভীর একটি সত্য – বহির্বিশ্বের উদ্দেশ্যমূলক অপপ্রচার বা প্রোপাগান্ডা। ইরানকে বোঝার জন্য সংবাদ শিরোনামের বাইরে যেতে হয়, ইতিহাসের গভীরে তাকাতে হয়। কারণ ইরান কেবল একটি রাষ্ট্র নয়; এটি একটি দীর্ঘ সভ্যতার অখণ্ড ধারাবাহিকতা। বিশ্বাসীদের জন্য এক রুহানি সিলসিলা।

বর্তমানের এই ইরান সেই জনপদেরই অংশ যেখানে সুফি মরমীবাদ তার পূর্ণ বিকাশ লাভ করেছিল—বিশেষত ইরান, খোরাসান, মধ্য এশিয়া ও আনাতোলিয়ায়। এখানেই সুফিবাদ একটি গভীর দর্শন, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ধারায় পরিণত হয়। ইসলামের ইতিহাসকে যদি কেবল আইন, ফতোয়া ও রাজনৈতিক সংঘর্ষের ইতিহাস হিসেবে দেখা হয়, তাহলে তার সবচেয়ে গভীর স্তরটিই অদৃশ্য থেকে যায়। কারণ ইসলামের জন্মের ভেতরে ছিল এক আধ্যাত্মিক বিপ্লব—একটি অন্তর্জাগরণের আহ্বান। সেই আহ্বান ছিল মানুষকে কেবল একটি ধর্মীয় পরিচয়ের অধীনে আনা নয়, বরং তাকে নিজের অন্তরের নূর আবিষ্কার করতে শেখানো, একটা আত্মিক যাপনে অভ্যস্ত করা।
ইসলাম, ইসলামি বিশ্ব, এর ইতিহাস ও ঐতিহ্য এতটাই বৈচিত্রময় যে কোন একতরফা দৃষ্টিভঙ্গিতে তা বিচার করা যাবে না। শুধু বস্তুবাদী আর যুক্তিবাদী চিন্তা থেকে দেখলে বোঝা যাবে না ইসলামের তাৎপর্য কিংবা ইরানের রুহানী শক্তি। একটা দেশ জাতি ধর্মকে যুক্তি তর্ক দিয়ে বুঝতে চাওয়াটাই বস্তুবাদীতা।
একটা পরাশক্তি যারা সারা বিশ্বকে অস্থির করে রেখেছে, যারা যখন ইচ্ছা একটা দেশের প্রেসিডেন্টকে তুলে আনতে পারে, যাকে যখন ইচ্ছা হত্যা করতে পারে, যে কোন দেশকে গাজায় পরিণত করতে পারে, সারা বিশ্ব জুড়ে অনাচার করে যাচ্ছে সেই সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে যারা এককভাবে মুসলিম বিশ্বের একটা ব্যালান্স ধরে রেখেছে, যারা ইসলামের অস্তিত্বের জন্য প্রায় একাই মোকাবেলা করছে তাদেরকে কট্টরপন্থী বলে বা নারী স্বাধীনতা ও হিজাবের মতো আপাত তুচ্ছ ও প্রশ্নসাপেক্ষ কিছু ইস্যুতে ঘায়েল করা বা দমিয়ে রাখা যাবে না!
পশ্চিমা মিডিয়ায় ইরানকে প্রায়শই একটি সরলীকৃত ইমেজে উপস্থাপন করা হয়—একটি সংকীর্ণ সমাজ, যেখানে ধর্মীয় কর্তৃত্ব সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং জনগণ সর্বদা দমিত ও নিপীড়িত। বাস্তবতা অবশ্য অনেক বেশি ভিন্ন ও জটিল। ইরান মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে শিক্ষিত ও আধুনিক সমাজগুলোর একটি; বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিল্প, সাহিত্য, সিনেমা এবং বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষায় দেশটির অগ্রগতি ব্যাপক এবং তাতে নারীদের অংশগ্রহণ অনেকাংশেই বেশি বা সমান। শক্তিশালী নাগরিক বিতর্ক, রাজনৈতিক মতভেদ এবং সামাজিক আলোচনার দীর্ঘ ঐতিহ্যও আছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক আলোচনায় এই সূক্ষ্ম সামাজিক বাস্তবতাগুলো প্রায়ই হারিয়ে যায়। প্রায়শই ইরানকে বিচার করা হয় বাহ্যিক প্রতীকের ভিত্তিতে—যেমন পোশাক বা ধর্মীয় আচারের মাধ্যমে—যেখানে ইতিহাসের গভীরতা ও সামাজিক প্রেক্ষাপট উপেক্ষিত থাকে।
ইরানকে বোঝার ক্ষেত্রে মূল সমস্যার বিষয় হলো তথাকথিত “নেটিভ” বা দেশীয় সমাজকে দেখার পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি। উপনিবেশ-পরবর্তী অনেক সমাজের ক্ষেত্রে একটি দ্বৈত মানদণ্ড কাজ করে: তারা হয় পশ্চিমা ধাঁচে সম্পূর্ণ আধুনিক হবে, নয়তো সম্পূর্ণ পশ্চাৎপদ ও অযৌক্তিক হিসেবে চিত্রিত হবে। মাঝখানের জটিল বাস্তবতা—যেখানে একটি সমাজ নিজস্ব ঐতিহ্য, ধর্মীয় সংস্কৃতি এবং আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে একসঙ্গে ধারণ করার চেষ্টা করে—সেটি প্রায়ই এই বয়ানে অদৃশ্য হয়ে যায়। ইরানের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যায়: দেশটি যদি পশ্চিমা সামাজিক মানদণ্ড পুরোপুরি গ্রহণ না করে, তবে তাকে সহজেই “ব্যাকডেটেড” বা “অসভ্য” বলে চিহ্নিত করা হয়। অথচ বাস্তবে অনেক সমাজই আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের মধ্যে নিজস্ব সমন্বয় তৈরি করার চেষ্টা করে—ইরানের অভিজ্ঞতাও তার ব্যতিক্রম নয়।
এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিজাব প্রশ্ন। সাধারণ ধারণা হলো ইরানে হিজাব কেবল রাষ্ট্রের আরোপিত নিয়ম। কিন্তু ইতিহাস একটু ভিন্ন গল্প বলে। শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির আমলে, বিশেষত বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে, পশ্চিমাকরণের নীতির অংশ হিসাবে হিজাব নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল এবং অনেক ক্ষেত্রে নারীদের তা খুলতে বাধ্য করা হতো। কিন্ত ইরানে হিজাবের প্রচলন ইসলাম আসার আগে থেকেই, পোশাক-ঐতিহ্যের অংশ হিসাবে বহু বিচিত্র হিজাবের প্রচলন সেখানে বহুকাল ধরেই। তো শাহর আমলে যখন আধুনিকতার নামে হিজাব তুলে দেয়ার চেষ্টা হয়েছে অগণিত নারী তখন হিজাব পরার অধিকার রক্ষার জন্য রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করে। ফলে ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের সময় হিজাব কেবল ধর্মীয় প্রতীক ছিল না; এটি সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য এবং রাজনৈতিক প্রতিরোধেরও প্রতীক হয়ে ওঠে।
একইভাবে পুরুষদের পোশাকের ক্ষেত্রেও শাহের সময় পশ্চিমা পোশাক—বিশেষ করে স্যুট ও নেকটাই—আধুনিকতার প্রতীক হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বিপ্লব-পরবর্তী সমাজে সেই অতিরিক্ত পশ্চিমাকরণের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াও দেখা যায়, নেকটাই নিষিদ্ধ হয়। এইসব বিষয় অনেক সময় বাইরের পর্যবেক্ষণে সরলভাবে “পশ্চাৎপদতা” হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, অথচ এর পেছনে রয়েছে আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য এবং রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার দীর্ঘ ইতিহাস।
ইরান তো আরব না, ইরানে মানুষ হিজাব পড়ে, ফ্যাশনেবল বোরকা পড়ে, কিন্তু আরব ও তালেবানদের মত মুখচোখ ঢেকে কিম্ভূতকিমাকার অস্বাভাবিক কিছু সাজে না—
মন্তব্য করুন