সিপিএন ডেস্ক
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১০:৩৪ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ
পাঠক সংখ্যা ৩৭৪ জন

না ফেরার দেশে সংগীত সম্রাজ্ঞী লালনকন্যা ফরিদা পারভীন

বাংলার লোকসংগীতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ফরিদা পারভীন আর নেই। ১৩ সেপ্টেম্বর, শনিবার রাত ১০টা ১৫ মিনিটে রাজধানীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। খবরটি নিশ্চিত করেছেন ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশীষ কুমার চক্রবর্তী। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। মৃত্যুকালে তিনি স্বামী ও চার সন্তান রেখে গেছেন।

দীর্ঘদিন ধরে কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন এই প্রথিতযশা শিল্পী। নিয়মিত ডায়ালাইসিসের অংশ হিসেবে ২ সেপ্টেম্বর তাঁকে মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু ডায়ালাইসিসের পর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকদের পরামর্শে তাঁকে ভর্তি করা হয়। এরপর থেকে তিনি আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
গত বুধবার তাঁর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটলে তাঁকে ভেন্টিলেশনে নেওয়া হয়। চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে শেষ পর্যন্ত তিনি না–ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন।
ফরিদা পারভীন ছিলেন লালনগীতি ও লোকসংগীতের জীবন্ত কিংবদন্তি। তাঁর কণ্ঠে লোকগান পেয়েছিল নতুন জীবন ও নতুন মাত্রা। দেশ ও জাতি আজ হারালো এক মহামূল্যবান সাংস্কৃতিক সম্পদকে।

শুরুতে নজরুলসংগীত, পরে আধুনিক গান দিয়ে ফরিদা পারভীনের যাত্রা শুরু হলেও জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে লালন সাঁইয়ের গান গেয়ে। এ প্রসঙ্গে ফরিদা পারভীন বলেছিলেন, ‘নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে এটা ঘটে। কুষ্টিয়ায় স্থানীয় এক হোমিও চিকিৎসক আমার গানের বেশ মুগ্ধ শ্রোতা ছিলেন। কিন্তু কেন জানি, তিনি আমার কণ্ঠে লালনগীতি শুনতে চাইতেন। তাঁর মনে হতো, লালনের গান আমার কণ্ঠে বেশি ভালো লাগবে। তাই হঠাৎ করেই আমাকে একদিন লালন ফকিরের গান শেখার পরামর্শ দেন। কিন্তু শুরুতে লালনের গান গাইতে চাইনি। আমার এই অনীহা দেখে বাবা আমাকে অনেক বুঝিয়ে গান শেখার জন্য রাজি করান। বলেন, “ভালো না লাগলে গাইবি না।” এই শর্তে রাজি হই এবং লালনসংগীতের পুরোধা ব্যক্তিত্ব মকছেদ আলী সাঁইয়ের কাছে তালিম নেওয়া শুরু করি। “সত্য বল সুপথে চল ওরে আমার মন”,  লালনের বিখ্যাত গানটি শিখি। একই বছর দোলপূর্ণিমা উৎসবে গানটি গাইলে শ্রোতারা আমাকে লালনের আরও একটি গান গাইতে অনুরোধ করেন। তখন আমি গান গাইতে অসম্মতি জানাই। শ্রোতাদের বলি, “আমি একটি গান গাইতে শিখেছি। এটাই ভালোভাবে গাইতে চাই।” এ গানই আমার নতুন পথের দিশা হয়েছিল। এরপর ধীরে ধীরে বুঝতে শিখি, কী আছে লালনের গানে। তাঁর গানে মিশে থাকা আধ্যাত্মিক কথা ও দর্শন আমাকে ভাবিয়ে তোলে। এ পর্যায়ে অনুভব করি, লালন তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে অনবদ্য এক স্রষ্টা হয়ে উঠেছেন। এটা বোঝার পর লালনের গান ছাড়া অন্য কিছু ভাবতেই পারি না।’

স্বাধীনতার পর ফরিদা পারভীন ঢাকায় চলে আসেন। তাঁর গাওয়া গান দিয়ে ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিস শুরু হলো। মোকছেদ আলী সাঁই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে ছিলেন। তিনি ফরিদা পারভীনকে ঢাকায় কিছু লালনের গান গাইতে বলেন। তাঁর অনুরোধে তিনি তখন ‘খাঁচার ভিতর’, ‘বাড়ির কাছে আরশি নগর’ গানগুলো গাইলেন। তখন তিনি কুষ্টিয়া থেকে এসে মোকছেদ আলী সাঁইয়ের কাছে লালনের গান শিখে ট্রান্সক্রিপশনে রেকর্ডিং করতে থাকেন। ফরিদা পারভীনের প্রথম স্বামী প্রখ্যাত গীতিকার ও কণ্ঠশিল্পী আবু জাফর। তাঁর সেই সংসারে রয়েছে তিন ছেলে ও এক মেয়ে; জিহান ফারিয়া, ইমাম নিমেরি উপল, ইমাম নাহিল সুমন ও ইমাম নোমানি রাব্বি।
লালন সাঁইজির গানের বাণী ও সুরকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে ফরিদা পারভীনের অবদান সর্বজনস্বীকৃত। শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বদরবারেও তিনি লালন সাঁইয়ের বাণী ও সুরকে প্রচারের কাজে নিয়েজিত ছিলেন। জাপান, সুইডেন, ডেনমার্ক, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ আরও বহু দেশে লালনসংগীত পরিবেশন করেছেন। লালনসংগীতে অবদানের জন্য ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশ সরকারের একুশে পদক পান ফরিদা পারভীন। এর বাইরে ১৯৯৩ সালে ‘অন্ধ প্রেম’ চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত ‘নিন্দার কাঁটা’ গানটির জন্য শ্রেষ্ঠ সংগীতশিল্পী (নারী) হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। তিনি ২০০৮ সালে জাপানের ফুকুওয়াকা পুরস্কার লাভ করেন। লালনশিল্পী হিসেবেই সুপরিচিত হন, তাঁর কণ্ঠে বেশ কটি আধুনিক ও দেশের গান জনপ্রিয় হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘তোমরা ভুলে গেছ মল্লিকাদির নাম’, ‘এই পদ্মা এই মেঘনা’ ইত্যাদি।

প্রধান উপদেষ্টার শোক

ফরিদা পারভীনের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। এক শোকবার্তায় প্রধান উপদেষ্টা বলেন, নজরুলগীতি, দেশাত্মবোধক নানা ধরনের গান করলেও শ্রোতাদের কাছে ফরিদা পারভীনের পরিচিতি ‘লালনকন্যা’ হিসেবে। পাঁচ দশক ধরে তাঁর কণ্ঠে লালন সাঁইয়ের গান মানুষের হৃদয় ছুঁয়েছে। তাঁর গান আমাদের সংস্কৃতির অন্তর্লীন দর্শন ও জীবনবোধকেও নতুন মাত্রায় তুলে ধরেছিল।

প্রধান উপদেষ্টা ফরিদা পারভীনের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

ফরিদা পারভীনের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। এক শোকবার্তায় উপদেষ্টা বলেন, ফরিদা পারভীনের অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। আমরা তাঁকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। আমি মরহুমার আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজনের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।’

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি আজ থেকে বঙ্গভবনে অফিস করবেন

কাউন্সিলর একরামুল হত্যাঃ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিফতাহ সেনা হেফাজতে

হজের নিবন্ধন শুরু, আবেদন করতে পারবেন না যারা

শেখ হাসিনাসহ ৪৫ জনের দুই মামলার বিচার শুরু আজ

সংবিধান সংস্কারে অগ্রগতি না হলে রাজপথে নামবে এনসিপি

তুরস্ক সফর শেষে দেশে ফিরেছেন সেনাপ্রধান

৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন

মহেশপুর সীমান্তে ৬ জনকে পুশ-ইনের চেষ্টা

শনিবার রাজধানীর যেসব এলাকার দোকান ও মার্কেট বন্ধ

ভারতীয়দের ভিসা-সুবিধা প্রত্যাহার করল চার দেশ

১০

দিল্লিতে সিজেপি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরকারের আনুষ্ঠানিক বৈঠক

১১

নির্ধারিত সময়ের দুই দিন আগেই দেশে ফিরলেন স্পিকার

১২

মোদি সরকারের আশ্বাসে ২৬ দিনের অনশন ভাঙলেন সোনাম ওয়াংচুক

১৩

স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিচ্ছেন রাষ্ট্রপতি,

১৪

ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে রুবাইয়াত হোসেনের ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ নির্বাচিত

১৫

ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে মোদির আমন্ত্রণ

১৬

আল-আকসা প্রাঙ্গণে ১,৩০০-এর বেশি ইসরায়েলি প্রবেশ

১৭

ছাত্র আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানালেন সালমান খান

১৮

যুক্তরাষ্ট্র–সৌদি আরবের বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর

১৯

পোশাক শিল্পের প্রতিবন্ধকতা দ্রুত দূর করার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

২০